ভালোবাসা – মেঘ আর আগুন

যেদিন বৃষ্টি পড়বে প্রচুর। হাওয়া দেবে অনেক। রাস্তায় হাঁটু জল জমবে। ইস্কুল অফিস বৃষ্টিতে ছুটি থাকবে। সেরকম একদিন আমরা দেরি করে ঘুম থেকে উঠবো।

আমাদের বাড়ির পাশের পুকুরটা জলে থইথই। পুকুরের জল, ড্রেনের জল, রাস্তার জল, সব মিশে যাবে একসাথে। পুকুরের কিছু কৌতূহলী মাছ বাইরের পৃথিবীটাকে দেখবে বলে রাস্তার জলে ঘোরাঘুরি করবে। পাশের বাড়ির শ্যামল কাকুর মতো আমিও প্যান্টের তলাটা হাঁটু অব্দি গুটিয়ে জলে নামবো ছাতা দিয়ে মাছ ধরতে। পোনা মাছ। টাটকা, জ্যান্ত।

ঘুম চোখে হাই তুলতে তুলতে তেল মশলা দিয়ে মাছ রান্না করবে তুমি। দুপুরে আমরা খিচুড়ি-বেগুনি-মাছভাজা-পাঁপড় খাবো। শেষে টমেটোর চাটনি। তারপর মৌরি চিবোতে চিবোতে আর ভেজা শালিকের ডাক শুনতে শুনতে গুটিসুটি হয়ে চাদরের ভেতর ঘুমিয়ে পড়বো আমরা।

ঘুম ভাঙবে বিকেলে। বৃষ্টি থেমে যাবে তখন। কিন্তু মেঘ থেকে যাবে কিছুটা। হালকা রোদ্দুর আর ভেজা মাটির গন্ধ। আগের দিন ছাদে মেলা জামা কাপড় গুলো সব ভিজে। বৃষ্টির আগে তুলে নিতে ভুলে গিয়েছিলাম। সেগুলো তুলতে ছাদে যাবো আমরা। আমি একটা সিঁড়ি টপকে টপকে তাড়াতাড়ি উঠে পড়বো ছাদে। তারপর ওপর থেকে বলবো, “ছাদে আসার সময় ঘুড়ি আর লাটাইটা এনোতো, আজকে ভালো হাওয়া আছে”।…

তুমি উড়ান দিও ঘুড়িতে, আমি প্রথমটা উড়িয়ে দেব।
তারপর ঘুড়ি যখন মাঝ আকাশে পৌঁছাবে, তখন তোমায় দিয়ে দেব সুতো। আমি ধরবো লাটাই। উড়িও তুমি প্রাণ খুলে। আর অন্য কোনো ঘুড়ি এলে প্যাঁচ খেলে কেটে দিও। আমরা একসাথে “ভোকাট্টা” বলে দুও দেব।

এরপর আস্তে আস্তে সন্ধ্যা নামবে। পাশের বাড়িতে সন্ধ্যা দেয়ার শাঁখের আওয়াজ শোনা যাবে। আমরা নীচে নেমে এসে ঘরে একটা প্রদীপ জ্বালাবো। প্রদীপের সামনে বসে থাকব আমরা দুজন। কাঁপা কাঁপা আলোয় অনেক্ষন তোমাকে দেখবো। তুমিও দেখবে আমায়। আস্তে আস্তে আরো কাছ থেকে দেখবো তোমায়। তোমার হাতে হাত ছোঁয়াব। তুমি অনুভব করবে একটা হালকা উত্তাপ। কাছে আসতে আসতে উত্তাপ আরো গাঢ় হবে। তারপর আস্তে আস্তে একটা সময়ে উত্তাপে গলে যাবো আমরা। আরেকটু পরে পুড়ে যাবো।

ভালোবাসায় মানুষ পুড়ে ছারখার হয়ে যায়। আমরাও প্রতিদিন ছাই হবো, একসাথে।

ভালোবাসা – যেন ফুল

তুমি : ভালোবাসা কি?

আমি : ভালোবাসা একটা ফুল।

তুমি : সে কি! ফুল তো ফোটে, আবার একদিন ঝরেও যায়।

আমি : না; ভালোবাসার ফুল ঝরেনা। ফুল থেকে ফল হয়, তা থেকে নতুন একটা বৃক্ষ সৃষ্টি হয়। ভালোবাসা জন্ম দেয়। ভালোবাসা এগিয়ে নিয়ে যায়। ভালোবাসা নতুন একটা ফুল তৈরি করে। ভালোবাসা ঝরেনা, আমাদের মধ্যে দূরত্ব গুলো ঝরায়। কখনো ভালোবাসা ঝড় তোলে আবেগের আকাশে। আবার কখনো ঝর্ণার মতো ধুয়ে দেয় ক্লান্তি। ভালোবাসা যেন ঝুড়িভাজার মতো নোনতা। ঝিরঝিরে বৃষ্টির দিনে মেঘেদের কোণটা

তুমি : কিন্তু কখনো যেন ভালোবাসা নিঃশব্দ বাঁশ ঝাড়ের মতো থমথমে।

আমি : কখনো আবার থামের মতো দৃঢ়।

তুমি : ভালোবাসা কি না থেমে থাকার রসদ?

… … … …

ভালোবাসা কে চিনতে চিনতে দিন বাড়লো, উঠলো রোদ। আবার সন্ধ্যা নামলো, বাজলো শাঁখ। ভালোবাসা যেন ভোর রাতে জেগে ওঠা কাকের ডাক।

ভালোবাসা তোমার আমার রক্তে থাক। না ই বা তাকে খুঁজলে, না ই বা বাড়ালে রক্তচাপ।

ক্যাপাসিটর

জম্পেশ করে তেল দিয়েছি চুলে। চপচপ করছে। বাঁ পাশে যত্ন করে করা শিথেটা জিওমেট্রি বক্সের স্কেলের থেকেও সরল। কপালের ওপর চুল গুলো চিরুনি দিয়ে চেপে বসানো। পরিষ্কার ভাবে দাড়ি কামিয়েছি। সাথে মনে রেখেছি, ঝুলপি কানের নীচে যেন না নামে। চোখে একটা বিনা পাওয়ারের রিমলেস চশমা পড়েছি। উঁচু কলারের একটা ভদ্র রঙের ফর্মাল শার্ট পড়েছি যাতে ঘাড়ের কাছের ক্যাপাসিটর ট্যাটুটা না দেখা যায়।

এরপরও বারবার আয়নায় নিজেকে দেখে জিজ্ঞেস করেছি, ঠিক লাগছে তো?

উঁহু। চোখের চাহুনি টা আর একটু নরম করো।

এবার?

এবার চোখটা হালকা একটু ছলছলে করার চেষ্টা করো।

এবার?

আরেকটু।

ধুর, আর পারছিনা। যা হয়েছে হয়েছে।

আমার সাধের লাল ক্যাপাসিটরটা সুক করে একবার স্নর্ট করে বেরিয়ে পড়লাম।

যাওয়ার সময় বাড়ির উল্টো দিকের ছোট মন্দিরটায় গিয়ে বললাম ঠাকুর মশাই, আমায় একটা চন্দনের ফোঁটা দেবেন?

উনি খালি গায়ে ধুতি পরে কিছু একটা জপ করছিলেন। আমার কথা শুনে একবার পিছনে ফিরলেন, কিন্তু কোনো কথা বললেন না। হাত দেখিয়ে বসতে বললেন। আমি বুঝলাম ওনার জপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উনি অন্য কিছু করবেন না। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমি ওনার সামনে থেকে চন্দনের বাটিটা তুলে টুক করে কড়ে-আঙ্গুল দিয়ে নিজের কপালে একটা টিপ বানিয়ে নিলাম। উনি আমায় দেখে হতভম্ব হয়ে “ওই কি করছো, ওই!” বলে উঠলেন। আমি শুরুৎ করে মন্দির থেকে বেরিয়ে ছুটলাম। আর বেরোনোর সময় বললাম খুব জরুরি কাজে যাচ্ছি ঠাকুর মশাই, আপনার আশীর্বাদটা করে দেবেন।

এরপর মিষ্টির দোকান। আমাদের চত্বরে সবচেয়ে নাম করা দোকান হলো প্রস্তাব মিষ্টান্ন ভান্ডার। খুব ভিড় থাকে। তবে ভিড় এমনি এমনি নয়। এখানকার জল ভরা সন্দেশ সারা উত্তর কলকাতায় নাম করা। দেখলাম এবার আবার এরা নতুন ট্যাগ-লাইন বানিয়েছে: খান , গলে যান, সম্মতি জানান।

আমি ভিড় ঠেলে অনেক কষ্টে এক বাক্স জল ভরা সন্দেশ নিলাম।

এরপর লোকাল ট্রেন। ভিড় থাকতে পারে বলে মনে করে অনেকটা ফচ-ফচ মেরে এসেছিলাম। কিন্তু সেরম ভিড় ছিলোনা ট্রেনে। দেখতে দেখতে চলে এল নামার স্টেশন।

তারপর বাসে যাত্রা। ভিড় বাসে দুটো মোটা লোকের মাঝখানে প্রায় চিড়ে চেপ্টা হতে হতে অবশেষে এসে পৌছালাম আমার গন্তব্যে।

এরপর এলো সবচেয়ে কঠিন কাজটা। বাড়িটা খুঁজে বের করা। ঠিকানা জানিনা।

একটু এগিয়ে দেখলাম একটা সবজির বাজার মতো বসেছে। সেখানে এক লাউওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা নায়েকদের বাড়িটা কোথায় জানেন?

প্রথমে সে বলল : ক্যা? ক্যা কন?

আমি: নায়েকদের বাড়ি চেনেন?

লাউ: আমি কেবল লাউ এর চাষ কথা হয় বলতে পারি বাবু। লায়েক কথা পাবো? আপনি ওই লগের বেগুনওলা কে জিজ্ঞেস করেন। উনি হরেক জিনিস জানেন বটে।

গেলাম বেগুনওলার কাছে।

আমি: দাদা ওই নায়েক দের বাড়ি কোথায় জানেন?

বেগুন: আপনি ওনাকে খুঁজছেন কি যে রোজ আমার লাইগা বেগুন খরিদ করে? হ্যাঁ চিনি তো ওনাকে।

আমি: আমি জানিনা উনি বেগুন কেনেন, না মাথায় মাখেন। ওনার পদবি কি নায়েক?

বেগুন: তাই হবে মন হয়। দেখতে তো নায়ক নায়ক বটে। আমি বইলা দিসি আসুন। আপনি এই রাস্তা ধরে চলতে থাকেন। কাউকে জিজ্ঞাসা করেন কি করলা বিদ্যা মন্দির কোনখানে। যেভাবে যেতে বলবে যাইবেন। তারপর ওখানে গিয়া জিজ্ঞাসা করবেন।

আমার লোকটার কথা খুব একটা ঠিক বিশ্বাস হলনা। গুগুল ম্যাপ এও এই উচ্ছে বা করলা কোনো বিদ্যা মন্দিরের খোঁজ পেলাম না। অনেক ঘোরাঘুরির পর একটা হুলো বেড়ালের মতো দেখতে লোককে আবার মিনতি করে বললাম: দাদা করলা বিদ্যমন্দির যেতে চাই। একটু সাহায্য করবেন?

লোকটা প্রথমে একটু হাসলো। তারপর বলল: এখানে একটাই ইস্কুল আছে । জামালপুর বিদ্যমন্দির। সেই ইস্কুলের হেডমাস্টার একদিন একটা গাড়ি কেনেন। টয়োটা করলা গাড়ি। সেই গাড়ি চড়ে তিনি ইস্কুলে আসতেন। সেই থেকে ইস্কুলের নামই হয়ে যায় করলা!

আমার একটু ভরসা হল। আমি বললাম: আপনি নায়েকদের বাড়ি চেনেন?

লোক: ও, আপনি নায়েক-বাড়ি খুঁজছেন? আগে বলবেন তো। …

ওনার নির্দেশ বরাবর পৌঁছে গেলাম একটা বড় লাল বাড়ির সামনে।

বাইরের গেটটা খুলে ঢুকে বাগান পেরিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করার দরজার সামনে এসে কলিং বেল বাজালাম।

ভেতর থেকে একটা মহিলার গলা শোনা গেল: পুতুল, দেখতো কে এল।

একটু পরে খুলে গেল দরজা। একজন মহিলা আমায় প্রথমে এক ঝলক দেখলেন। তারপর চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন: কাকে চান?

তার এক হাতে তখনো রান্নার খুন্তি ধরা।

আমি বললাম: বিহঙ্গ বাবু আছেন? একটু ওনার সাথে কথা বলতে এসেছিলাম।

মহিলা: আসুন।

আমি পেছন পেছন গেলাম।

মহিলা: ওখানে বসুন।

আমায় বসার ঘরে বসিয়ে দিয়ে রান্না করতে চলে গেলেন যিনি দরজা খুলেছিলেন।

আমি বসলাম একটা চেয়ারে গুটি সুটি হয়ে।

চারধারে সমস্ত আসবাব পুরানো আমলের সেগুন কাঠের তৈরি। সিলিং এ করিকাঠ গুলো দেখে বোঝা যায় বাড়িটাও বেশ পুরানো।

রুপোর চামচ মুখে একটা চার পাঁচ বছরের বাচ্ছা বারবার দরজার কাছে ঘোরাঘুরি করছিল আর হাসছিল। বোঝার চেষ্টা করছিল আমি কে।

একটু পরে একজন বলে উঠলো: ডিম, ওদিকে যেওনা। এদিকে এস।

বাচ্ছাটা তাও ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। হঠাৎ কেউ একজন ডিমকে কোলে তুলে অন্য দিকে নিয়ে চলে গেল।

আমি ভাবছিলাম, ডিম আবার কারুর নাম হয়? কে জানে, এদের কাছে পাখিদের নাম যদি খুব আদরের হয় তাহলে পাখির  ডিম ও আদরের নাম ই হবে হয়তো।

হঠাত ঘরে ঢুকলেন একজন ভদ্রলোক। কি নাধরকান্তি চেহারা! প্রসস্থ ললাট, উন্নত নাসিকা! বুঝতে অসুবিধা হলনা যে ইনিই নায়েক বাবু।

আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম আর নমস্কার করলাম।

উনি আমার দিকে একবার তীক্ষ্ণ ভাবে তাকালেন। তারপর একটু ভুরু কোঁচকালেন, আর বললেন :তোমায় তো ঠিক চিনলাম না।

আমি অল্প হেসে বললাম: এটা কোনো বড় বেপার নয়। আমিও তো আপনাকে চিনতাম ই না যদি আজকে এখানে না আসতাম। ..

উনি চেয়ারে বসতে যাবেন এমন সময় খট করে একটা শব্দ হল। উনি “আউউউ..” করে সেয়ালের মত চেঁচিয়ে উঠলেন।

আমি এগিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম কি হয়েছে। উনি বললেন: আরে কিছুনা কিছুনা, পায়ের কড়ে আঙ্গুলটা টেবিলের পায়াতে ঠুকে গেল।

আমি ওমনি ঝুকে পরে ওনার পায়ে হাত দিয়ে বললাম: কই দেখি, লাগেনি তো জোরে?

উনি একটু ইতস্তত হয়ে বললেন: একি করছ, কিছু হয়নি।

আমি বললাম : আপনার পায়ের ধুলোটা নিতেই হত, তাই ।

নায়েকবাবু: না সে ঠিকাছে, কিন্তু তোমায় তো ঠিক চিনলাম না।

আমি: চিনতে আর কতক্ষন , চিনে যাবেন ঠিক। আমি আসলে আপনাকে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছিলাম। কিন্তু কাকু, তার আগে আপনি এই মিষ্টির প্যাকেটটা নিন।

নায়েকবাবু: মানে? এ আবার কি? তোমায় চিনিনা জানিনা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে নেব? এ আবার হয় নাকি?

আমি: কিন্তু কাকু, যে জরুরি কথাটা বলব সেটা তো মিষ্টির প্যাকেট ছাড়া হবেনা। আপনাকে এটা নিতেই হবে। আপনি না নিলে আমি খুব দুঃখ পাবো।

নায়েকবাবু: ঠিকাছে ঠিকাছে, রাখো টেবিলের ওপর।

আমার মুখে হাসি ফুটলো। জ্বলে উঠলো মুখটা।

আমি: এইতো! থ্যাংক ইউ কাকু। লাভ ইউ।

কাকু একটু গম্ভীর ভাবে বললো: এসব লাভ টাভ আমাদের বাড়িতে চলেনা। সাবধান। তুমি এভাবে বললে বলে নিলাম। তার জন্য এত উচ্ছসিত হয়ে যেওনা।

আমি: নানা একদমই নয় কাকু। লাভ কথাটা ভুল করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। আসলে আপনি ব্যবসা করেন তো, তাই সকাল থেকেই ভাবছিলাম লাভ কথাটা আপনার সাথে কথা বলার সময় কোথাও একটা ঢোকাতে হবে। কিন্তু কিভাবে ঢোকাব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আপনি মিষ্টিটা নিলেন, আমাদের মিলঝুল হল, ওমনি তিরিক করে মাথায় বাল্ব জ্বলে উঠলো, আর লাভ কথাটা পান হিসেবে ঝেড়ে দিলাম।

নায়েকবাবু: এসব কি বলছো বুঝছিনা ভাই আমি। পান হিসেবে ঝেড়ে দেয়া আবার কি? পানের পিক ফেলা বোঝাতে চাইছো?

আমি: ইশ!কাকুউউউ! আপনি আমায় চিনলেন না। আমি আপনার সাথে পানের পিক ফেলার মতো নোংরা কোনো বেপার নিয়ে কথা বলতে পারি? আমায় দেখে মনে হয়?

আমি করুন মুখ করলাম।

নায়েকবাবু: না সে তোমায় দেখে তো মনে হয়না তুমি পান খাও বা করো। ভদ্র সভ্যই আচার ব্যবহার, কিন্তু এটাও ঠিক যে আমি তোমায় সেভাবে চিনিনা।

আমি: আরে কাকুঊঊ। চাপ নেবেন না। চিনে যাবেন। চিনে যাবেন। ঠিক চিনে যাবেন। একদম চীনের প্রাচীর পেরিয়ে চিনে যাবেন! আপনি আর আমি তো অনেকটা চীন আর ভারতের মতোই, তাই না? হ্যাঁ, হয়তো একটু সময় লাগবে। একটু ধৈর্য চাই। বা একটু খুঁজে নিতে হবে..

নায়েকবাবু: খুঁজে নিতে হবে বলতে?

আমি: মানে এই ধরুন আমার মধ্যে, আমার কথা বার্তার মধ্যে, আমার হাবভাবের মধ্যে, আপনার নিজের আমার বয়সে থাকা কালীন কাটানো সময় গুলোর কথা মনে পড়ে না? সেই চায়ের দোকানে বসে আড্ডা, সেই ভ্যানাদার কচুরির দোকান?

নায়েকবাবু: এই দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি নির্ঘাত গুল মারছ। কারণ আমি চা খাইনা! তবে হ্যাঁ কচুরির দোকান একটা ছিল বটে, সেটাও নুরুল দার, ভ্যানা নয়। সে কি স্বাদ! সেগুলো কি আর ভোলা যায় বাছা!

আমি: হ্যাঁ কাকু। ওই ভ্যানা বলতে নুরুলদাকেই বুঝিয়েছিলাম।

ভেতর থেকে একটা চিৎকার এল: য়‍্যাই তুমি এখনও চানে গেলে না?

নায়েকবাবু একটু তড়িঘড়ি করে বললেন: ভাই, একটু শর্টে বলো, শর্টে। তোমার বক্তব্যটা কি?

হঠাৎ দরজা দিয়ে একজন মহিলা ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। অত্যন্ত লাবন্যময়ী । সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছিলেন। কিন্তু তাকে দেখব কি, ঝড়ের গতিতে ঢুকেই একটা বাটি টেবিলে রেখে আবার হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। বেরোনোর সময় বলতে বলতে গেলেন,: বড়াটায় নুন ঠিক আছে কিনা দেখতে বলল কাকিমা।

একবারও আমার দিকে তাকালোই না!

কাকু বাটি থেকে বড়াটা তুলে নিয়ে অর্ধেক করে একটা অর্ধেক মুখে পুরলেন আর আরেকটা অর্ধেক বাটিতে রাখলেন। তারপর আমার দিকে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, : খেয়ে দেখো, মাছের ডিমের বড়া। বেশ ভালো হয়েছে।

“এই বোনোমালা..”, হাঁক পাড়লেন কাকু। “চমৎকার হয়েছে বড়াটা। আরেকটা পাওয়া যাবে নাকি? এখন?

ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলোনা।

আমি বড়াটা মুখে পুরলাম। অসাধারণ।

কাকু ভুরু নাচিয়ে বললেন,: কি? দারুন না?

আমি মাথা নাড়লাম।

আমি: আর যিনি দিয়ে গেলেন ওনাকে তো ঠিক চিনলাম না।

নায়েকবাবু: ও? ও তো পাখি, আমার মায়ের দেখভাল করে। বলতে পারো আমার মেয়ের মতই।  কিন্তু দাঁড়াও দাঁড়াও! তুমি এমন ভাবে বললে”ওনাকে ঠিক চিনলাম না” , যেন আমার বাড়িতে কতদিনের যাতায়াত! একটু খুলে বলো তো বেপারটা কি!

আমি: কিছুনয় কাকু। বলছি বলছি। আপনি আগে ওই নুরুলদার ঠেকের গল্পটা শেষ করে নিন।

নায়েকবাবু: ঠেক? নুরুলদার কচুরির দোকান ছিল, ঠেক নয়! আর যারা ওসব জায়গায় যায় আমি তাদের একদম পছন্দ করিনা। তুমি যাও নাতো?

আমি: নানা কাকু, আমার তো বাড়িতেই গাছ আছে, ওসব নোংরা জায়গায় কেউ যায় নাকি? আমি ‘গাছ লাগান প্রাণ বাঁচান’ বা ‘পাতা বাঁচান’ এই সবেই বেশি বিশ্বাসী।

নায়েকবাবু: ও তুমিও গাছ করো? আমার ও জানো খুব গাছ করার শখ। গত সপ্তাহেই বেশ কয়েকটা বনসাই এনেছিলাম। তবে শুকিয়ে যাচ্ছে কেমন একটা।

আমি: আরে কাকু, এ জমানায় বনসাই টনসাই কেউ লাগায় নাকি? আমি আপনাকে সব গাছের পিতৃ গাছ এনে দেবো।

নায়েকবাবু: সেটা কি গাছ বলোতো? পিতৃ গাছ বলে তো কোনো গাছ শুনিনি।

আমি: বুঝলেন না, বাবা গাছ। বাবা।

নায়েকবাবু: না ভাই, এই গাছের কথা শুনিনি। মালীকে জিজ্ঞেস করে দেখবো তো। তো তুমি এরপর যবে আসবে একটু এনে দেখিও তো।

আমি: হ্যাঁ কাকু, নিশ্চই। তবে একটা প্রশ্ন ছিল কাকু। যদি অপরাধ না নেন করতে পারি?

নায়েকবাবু: হ্যাঁ, বলো, এত কথা যখন বলছি এই প্রশ্নটাও করেই ফেল।

আমি: আচ্ছা, আপনি আপনার কলেজ লাইফে কখনো নেশা করেছেন? মানে আমি শুনেছি নেশা টেশা করলে নাকি নতুন চিন্তা ভাবনা মাথায় আসে, সৃজনশীলতা বাড়ে, গবেষকেদের গবেষণার একটা মুখ্য উপাদান নাকি নেশা দ্রব্য?

নায়েকবাবু: এসব কি বলছো তুমি? শোনো, আমার মনে হয় তুমি একটু অন্য দিকে চলে যাচ্ছ।

আমি: নানা কাকু, আমি এগুলো আমার কিছু বন্ধুদের থেকে শুনেছি, তাই ভাবলাম আপনাকে জিজ্ঞেস করি। আপনি গুরুজন বলে কথা।

নায়েকবাবু: আমি নেশা করিনি কখনো। তবে আমাদের কলেজে কয়েকটা ছেলে ছিল যারা এসব করতো। আমি সব সময়ই ওদের থেকে দূরে থাকতাম।

আমি: কিন্তু আপনার কখনো মনে হয়নি যে একবার একটু ট্রাই করে দেখি?

আমি চোখ টিপলাম।

নায়েকবাবু: না। তুমি আগে বলো তুমি এগুলো করো না তো?

আমি কিছু না বলে পকেট থেকে একটা কৌটো মতো(ক্যাপাসিটর) বার করলাম।

আমি: আমি আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।

বলে আমি আমার হাতে লাল ক্যাপাসিটরটা ডলতে থাকলাম। ডলতে ডলতে বললাম আমার ইচ্ছে আছে জীবনে এমন একটা জিনিস বানাবো যেটা শুকলে মানুষ যা চাইবে তাই পেয়ে যাবে। মানে সত্যিকারের সেটা না ঘটলেও চোখের সামনে সেটাই দেখবে।

কাকু অবাক হয়ে বললেন, : আমি ঠিক বুঝলাম না । কিন্তু তোমার হাতে এটা কি বলোতো?

 

আমি বললাম : কাকু ,এটা একটা ক্যাপাসিটর। ইলেক্ট্রিক সার্কিটএ থাকে। এই দেখুন, উপরে একটা কৌটো মতো আর নীচে দুটো তার। আপনি এটাকে চার্জ দিয়ে এটার মধ্যে অনেক শক্তি জমিয়ে রাখতে পারবেন । আর যখন আপনার শক্তি দরকার এর থেকে শক্তি নিতে পারবেন। আপনার আমার সবার জীবনে ক্যাপাসিটর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।

 

বলে আমি আমার নাকের কাছে ধরলাম ক্যাপাসিটরটা।

কাকু বললেন : তো তুমি এটা নিয়ে ঘুরছ কেন?

আমি: কাকু আমি ছোট থেকেই সায়েন্স, ইলেক্ট্রিসিটি, সার্কিট এসব নিয়ে এত পাগল যে যেখানে যাই কিছু না কিছু নিয়ে যাই। আর আমার নতুন যন্ত্রের গন্ধ শুকতে ভালো লাগে। আমি অদ্ভুত একটা আনন্দ পাই। না শুকলে মনই ভরে না।

বলে আমি খুব জোরে স্নর্ট করলাম কৌটোটার ভেতরের কিছু একটা।

নায়েকবাবু: তুমি তো খুব ডেডিকেটেড ছেলে দেখছি। জানো, ছোটবেলায় আমার ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞান নিয়ে পড়বো, গবেষণা করবো, কিন্তু একসময় টাকা পয়সার অভাবে তা আর হয়ে উঠলো না।

আমি: আমি বুঝি কাকু আপনার কষ্টটা। দুঃখ পাবেন না। আপনিও একটু শুঁকে দেখুন, খুব মিষ্টি সুন্দর গন্ধটা।

নায়েকবাবু: বলছো? খারাপ কিছু নেই তো এতে?

আমি: কাকুঊঊ, কি খারাপ থাকবে বলুন? নিয়ে দেখুন একবার। তারপর বলবেন।

কাকু ক্যাপাসিটর টা হাতে নিলেন, ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন কিন্তু এর ওপরে একটা ছোট ফুটো রয়েছে কেন ?

আমি : ফুটো কাকু আমাদের জীবনে দেহে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে । ওটা নিয়ে অবাক হবেন না ।

এবার কাকু হালকা শুঁকে বললেন, :এই, এর ভেতরে পাওডারের মতো কি যেন রয়েছে। আর তুমি যেরম বলছিলে ওরম গন্ধ তো কিছু পেলাম না। তবে মাথাটা কেমন একটা ধরে উঠলো হঠাত করে ।

আমি বললাম,: ওটা একটু হয়। চাপ নেবেন না। আমারও হয়। গুছিয়ে কথা বলতে সাহায্য করে এটা আমায়। আপনার হয়তো হালকা সর্দি আছে তাই গন্ধটা বুঝতে পারেননি আপনি । একটু জোরে আর একবার টেনে দেখুন পান কিনা কিছু গন্ধ ।

কাকু আর একবার টেনে আমায় ফেরত দিলেন ক্যাপাসিটর টা। তারপর একটু ঢুলু ঢুলু চোখে বললেন: বাইরে কি খুব বৃষ্টি পড়ছে, ঝড় হচ্ছে?

আমি বললাম: কৈ নাতো।

কাকু বললেন,: কয়েকদিন আগেই আমাদের বাড়িতে বাজ পড়ে টিভি, ওয়াশিং মেশিন সব খারাপ হয়ে গেছে। তাই আমি টিভির তারটা খুলে দিয়ে আসি।

বলেই তিনি উঠে যাচ্ছিলেন।

আমি গিয়ে ওনাকে আটকালাম।

আমি: কাকু, ঝড় আসেনি। আপনি বিশ্বাস করুন। ঝর আসলে আমি নিজে গিয়ে টিভির তার খুলে আসবো।

নায়েকবাবু: ও তাই? কিন্তু আগের টিভিটা খুব বাজে ভাবে ভেঙে গেছিল।

আমি: তাই? কাকু, আমি এরকম অপঘাতে মৃত্যু হওয়া যন্ত্র কালেক্ট করেই থাকি। আপনি যদি কিছু না মনে করেন আমি কি আপনার পুরোনো ভাঙা টিভিটা নিতে পারি?

কাকু আমার দিকে কেমন একটা হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন। একটু পর হাসলেন। দিয়ে বললেন: টিভির ভেতরে  অনেক ক্যাপাসিটর আছে বলে? হা হা হা ! এটাই তোমার জরুরি কথা তাইনা? হা হা হা.. আচ্ছা টিভিতে যে লোকটা রোজ খবর পড়ে সে কি টিভির ভেতরেই থাকে ?

আমি মনে মনে বললাম আপনি খুব ভালো করেছেন বিজ্ঞানী হননি।

উনি হাসতে থাকলেন। আমি বললাম : কাকু একটা মজার কথা মাথায় এলো, বলব?

কাকু বললেন : বলো।

আমি বললাম আচ্ছা ধরুন এরম একটা দুনিয়া আছে, যেখানে সব মানুষ সব সময় নেশাগ্রস্থ থাকে। তাদের আলাদা করে নেশা করতে হয়না । তারা এমনিতেই সব সময় চুর হয়ে থাকে নেশায়। এটাই ওদের জন্য সাভাবিক। ওদের দুনিয়ায় এক ধরনের পাতা পাওয়া যায় যেটা শরীরে নিলে নেশাগ্রস্থ থেকে সাভাবিক অবস্থায় আসা যায়। বুঝলেন ?

কাকু মাথা নাড়লেন।

আমি : আপনি ধরুন সেরম একটা দুনিয়ায় পৌছে গেছেন। আর সেখানে নেশা কাটিয়ে সাধারণ হওয়া টা আইন বিরুদ্ধ। তখন আপনি কি করবেন? আপনি কি আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে সেই পাতার খোজ করে সেটা খেয়ে সাধারণ হবেন, নাকি বেআইনি কাজ না করে আপনি নেশাতেই থাকবেন ?

কাকু বললেন, অত সত জানিনা বাবু, আমি টাকেশ্বরীর এক হাঁড়ি কেওরাজল দেওয়া বিরিয়ানি খাবো।

আমি হেসে ফেলে জিজ্ঞেস করলাম টাকেশ্বরী আবার কোন দোকান? ঢাকেশ্বরী শুনেছি, কিন্তু টাকেশ্বরী তো শুনিনি।

কাকু বললেন, আরে ওই দোকানটা চেননা? যেখানে খাবার টেবিল নেই কোনো, শুধু চেয়ার আছে। টেবিলের বদলে টাকওয়ালা লোকেরা উবু হয়ে চেয়ারের সামনে বসে থাকে, আর তাদের টাকের ওপর থালা রেখে কাস্টমাররা খায়। এই য়ামবিএন্স টাই ওদের স্পেশালিটি।

আমি মনে মনে ভাবলাম বয়স হলে, যদি টাক পরে যায় এই রেস্তোরাঁর ওয়েটার হওয়া যাবে।

কাকু মনে হয় মনে মনে টাকেশ্বরীতেই পৌঁছে গেছিলেন, হঠাত ওনার ফোন বেজে উঠলো।

কাকু বললেন, : আমার মেয়ে ফোন করেছে কোলকাতা থেকে, একটু কথা বলেনি।

আমি: হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই।

নায়েকবাবু (ফোনে): হ্যাঁ মা বল, কেমন আছিস? … … … খাওয়া দাওয়া করছিস তো ঠিক করে?… … … আমাদের এখানে তো খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে, তর ওখানে বৃষ্টি পরছে নাকি?… … …আজকে জানিসতো একটা ছেলে এসেছে আমাদের বাড়িতে ক্যাপাসিটর বিক্রি করতে। তো সে কয়েকটা ক্যাপাসিটরএর গন্ধ শোকালো ; ভারী মিষ্টি গন্ধটা। … … … … … … … আচ্ছা আচ্ছা, ভালো থেকো রাখলাম ,হ্যাঁ ?

আমি মনে মনে ভাবলাম, কি ! আমি ক্যাপাসিটর বিক্রি করতে এসেছি?

ভেতর থেকে আবার শুনতে পেলাম,: তুমি চানে আজকে যাবে? না যাবেনা?

কাকু যেন কিছুই শুনতে পেলেন না। আমি বললাম,: কাকু কলকাতার নামকরা দোকান, প্রস্তাবের জল ভরা মিষ্টি।

আমি একটা মিষ্টি বাক্স থেকে বের করে কাকুর মুখের কাছে ধরলাম। কাকু সুবোধ বালকের মতো খেয়ে নিলেন।

হঠাৎ কাকিমা ঘরে ঢুকে এলেন। বললেন: তুমি কি বলতে চাও বলোতো।

আমি কয়েকবার ঢোগ গিলে বললাম,: আমি আসলে আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমি তাই বিয়ের প্রস্তাব এনেছিলাম।

কাকু মিষ্টি খেতে খেতে মুচকি হাসলেন, গলে গেলেন। তারপর হাত তুলে বুড়ো-আঙ্গুল দেখিয়ে “অসাম” আর “জিও” বলে  সম্মতি জানালেন। বললেন শুধু তারিখটা জানিও। বাকিটা আমাদের ।

এসব দেখে কাকিমার তো চোখ কপালে উঠলো।

কাকু বললেন, আর কয়েকটা ক্যাপাসিটর হবে?

আমি ভাবলাম, সত্যিই কি খুব অদ্ভুত প্রস্তাব?

cap - Copy

 

 

বিষাক্ত মানুষ

আমি বোবা। বলতে পারিনা, শুধু বুঝতে পারি। আর ভাবতে ভালোবাসি। বালিগঞ্জের বস্তিতে বসবাস। ঠেকনা দেওয়া ঘরে ফ্যান জোটেনি। তাই গরমে ঘেমে প্রতি রাতে মাকর্শার জাল গুনি, আর এক দৃষ্টিতে দেখি কিভাবে ছোট ছোট পোকা গুলো একের পর এক জড়িয়ে যায় জালে। তাদের নির্বাক ছটফটানি।

সেভাবেই আমাকেও রোজ যেতে হয় বস্তির একটা সোশ্যাল রিফর্ম স্কুলে। ইচ্ছা নেই পড়াশোনা করার। তাও যাই। কারণ আমরা গেলে ওদের ভালো লাগে। ওরা মনে করে আমাদের বা সমাজের বিশাল উপকার করছে। মনে করে এভাবে সমাজ বদলে দেবে। কিন্তু আমি জানি। ঘন্টা বদলাবে!

আমাদের ক্লাস নেয় একটা দিদি। দিদিটা মনে হয় ভালো। কিন্তু আমরা বস্তির মানুষ, আমরা শিখিনি ভালো খারাপ বুঝতে। আমাদের বুদ্ধি কম। তাই আমাদের কাছে দিদিও আর পাঁচটা বাইরের মানুষের মতোই। বস্তির বাইরের পৃথিবীটা আমাদের ঘেন্না করে। দিদি মনে হয় করেনা। দিদির মধ‍্যে একটা অন‍্যরকম ব‍্যাপার আছে। বাইরে থেকে একটু শান্তশিষ্ট স্বভাবের মনে হলেও কখনো কখনো একটা অন‍্য মানুষ উঁকি দেয় ভেতর থেকে। চোখটা টানা আর কটা। চুল বাঁধা হলেও চুলের আগায় ঢেউ খেলনো কারসাজি। ঠোঁটটা ছোট, সুন্দর, কিন্তু লিপিস্টিকের পেছনে তামাক টেনে খয়েরি হয়ে যাওয়া চামরা আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। কখনো কখনো মনে হয় দিদি আমাদের-ই একজন। শুধু বাইরে একটা মুখোশের জাল লাগানো আছে। কিন্ত আমি কখনো সেই জালটা সরিয়ে দেওয়ার সাহস পাইনি। পাছে জালে জড়িয়ে যাই!

আমি তো বলতে পারিনা। তাই শুধু তাকিয়ে থাকি দিদির দিকে। আমরা বস্তিতে মারপিট আর পেঁয়াজি করেই বড় হয়েছি। ভালোমানুষি খুব একটা ধরা দেয়না আমাদের চোখে। লোকে বলে আমরা শুধু দেখি চামড়া।

সেদিন মেঘলা কলকাতা। ক্লাসে যাইনি কারণ বস্তির ছেলেদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম বাজারের ধারে। আড্ডায় আমার ভূমিকা হল শুধু শুনে যাওয়া আর মাথা নাড়া। তিন নম্বর বিরিটা শেষ হতেই আমাদের নেতা হুলো বলল “চ একটু কচুরি খেয়ে আসি”। পয়সা তো ছিলনা পকেটে। কিন্তু খেতে পয়সা লাগেনা, লাগে ক্ষিধে।

আমরা সোজা গিয়ে বসে পড়লাম কানুদার মিষ্টির দোকানে। কানুদা আমাদের দেখে একবার চোখ কোঁচকালো। জিজ্ঞেস করল “কিরে হুলো পয়সা আছে তো?”। হুলো তো প্রশ্ন করার আগেই উত্তর ঠিক করে বসে ছিল। বলল “এভাবে বলছো কানুদা? আমরা পাড়ার ছেলে হয়ে আমরা তোমার টাকা মারবো?” কানুদা একটু ভরসা পেয়ে বললো “ঠিক আছে তোরা প্লেট নিয়ে বস আমি কচুরি দিচ্ছি।”

শুরু হল জোর কদম খাওয়া। আমি বরাবরই একটু সময় নিয়ে খাই। সেটা জেনেও হুলো আমার পাতে কানুদাকে বলে বেশি বেশি করে কচুরি দিয়ে দিলো। আমি তো একদম মগ্ন হয়ে খেয়ে চলেছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার দলের বাকিরা কেউ নেই দোকানে। আমি কানুদাকে অঙ্গভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করলাম বাকিরা কোথায়। কানুদা বললো ”ওরা তো চলে গেছে তোর সময় লাগছে দেখে। আর বলে গেল তোকে নাকি খাবার টাকা দিয়ে গেছে।” আমি তো শুনে অবাক! আমার পকেট ফাঁকা! আমি একবার কানুদাকে বোঝানোর চেষ্টা করবো ভাবলাম যে আমার কাছে টাকা নেই। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো হুলোরা এত বড় বড় কেস খেতে খেতে পালিয়ে গেল আর আমি এই সামান্য কচুরি চুরি করে পালাতে পারবোনা? লাগালাম কচুরি ফেলে ছুট!

কানুদা আমি দৌড়াচ্ছি দেখে হৈ হৈ করে “ধর শালা কে ” বলে ছুটলো পেছনে। চুরি করে ছোটার সময় একটা নিয়ম হল বারবার পেছনে তাকাতে নেই। তাতে ছোটার ফোকাস হারিয়ে যায়। উর্ধঃশ্বাসে শুধু ছুটে যেতে হয়। আমি ঠিক সেই ভুলটাই করলাম। পেছনে ফিরে দেখছিলাম কানুদা কতটা দূরে। ল্যাপ-এ বিট দিয়ে দিলে আবার মুশকিল হয়ে যাবে!

দেখলাম বেশ অনেকটা পেছনে পড়ে গেছে নাদুস নুদুস কানুদা। স্বস্তির নিঃশাসটা নেওয়ার আগেই পায়ের তলা থেকে মাটিটা সরে গেল। মাথাটা জোরে গিয়ে লাগলো একটা কংক্রিটে। পড়লাম আমি হাই ড্রেনে। পেছনে তাকানোর ফল।

সাঁতার কাটতে জানি। কিন্তু মাথায় খুব ব্যথা করছিল। পাটা নাড়াতে গিয়ে বুঝলাম পায়েও লেগেছে। তার ওপর ড্রেন তো আর কলেজ স্কয়ের এর সুইমিং পুল নয় যে সাঁতার কেটে বেরিয়ে যাবো। চারদিকে ভর্তি পাঁক। আমি বুঝলাম আমি আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছি। বাঁচার চেষ্টা করে খুব একটা লাভ হবে না। দেহটা হালকা করে দিলাম। মাথার কাছটায় বালিশের মতো লাগছিল। আরাম করে পেতে দিলাম বালিশে মাথা। হঠাৎ সেই বালিশটা আমার চুলের মুঠি ধরে নাড়া দিল। বুঝলামনা কিছু। বালিশটা আমার চুলটা টেনে পাঁক থেকে আমায় উপরে তুলল। আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপছি। হুলো আমায় ড্রেনের পাশে শুয়ে দিয়ে বলল ” দেখে দৌড়াতে পারোনা গান্ডু?” আমি উঠে জড়িয়ে ধরলাম হুলোকে।

ততক্ষনে রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে গেছিলো। ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ দেখি ক্লাসের দিদি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো কোথায় লেগেছে। দিদি ডাক্তারি পড়েছে। আমি হাত দিয়ে দেখলাম মাথায় কাঁধে আর পায়ে। আমার ঠোঁট দিয়েও রক্ত ঝরছিল। দিদি সঙ্গে সঙ্গে এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিল। হসপিটালে অনেক কটা স্টিচ পড়ল। দিদি বললো হসপিটালে না থেকে দিদির বাড়িতেই রাত্রে থেকে যেতে। গেলাম সেখানেই।

বড় বাড়ি। একাই থাকে দিদি। এত বড় বাড়িতে প্রথমবার ঢুকে একটু অদ্ভুত লাগছিল। দিদির ঘরে অনেক বই এদিক ওদিক ছড়ানো। পাশে একটা ডায়েরিও চোখে পড়ল। তার ওপর জালের মতো একটা নক্সা করা। অনেকদিন পড়ে থেকে ধুলো পড়ে গেছে ডায়েরিতে । আমি সেই ধুলোর ওপর আঙুল দিয়ে কি একটা আঁকার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সেটা হিজিবিজিতে গিয়ে ঠেকল। যেন একটা অনেক লম্বা সাপ নিজেই নিজের প্যাঁচ এ জড়িয়ে গেছে!

আমায় খেতে দিয়ে দিদিও বসলো খাবার নিয়ে। আমি বলতে পারিনা। তাই দিদিই বলছিল। আমি শুনছিলাম দিদির একাকিত্বের গল্প। সেই ভেতরের অন্য মানুষটা যেন বেরিয়ে আসছিল বারবার। মনে হচ্ছিল পাশের বাড়ির বিধবা মাসির গল্পই যেন শুনছি। কখনো কখনো এক ভাবে তাকাচ্ছিলাম দিদির দিকে। সেই চাহনির বিষ!

খেয়ে উঠে আয়নায় দেখলাম ঠোঁটে কালশিটে পরে নীল হয়ে গেছে। ব্যাথাও আছে ভালোই। দিদি আমায় নিয়ে গিয়ে শুয়িয়ে দিলো বিছানায়। আমি চোখ বুজে শুয়ে ছিলাম। ঘুম নেই।

একটু পরে দিদিও এসে আমার পাশেই শুলো। ঘরে আলো নেই। শুধু পর্দার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে ল্যাম্প পোস্টের আলো এসে পড়ছিল আমার কাঁধের সেলাইটার ওপর। একটা রাতের পাখি ডাকছিল বারবার। আমি কান খাঁড়া করে শুনছিলাম তার ডাক। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার কাঁধের কাঁচা সেলাই এর ওপর দিদির হাত। ব্যথা হল একটু। কিন্তু স্থির রইলাম। দিদির হাতের ছেঁকায় কাঁপুনি আসছিল। আমি এবার চেপে ধরলাম হাতটা। ফিকে আলোয় দেখতে পেলাম একটা দেহের তোবড়ানো ছায়া। ছায়াটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল অন্ধকারে আর চেপে বসলো আমার ওপর। মনে হল একটা ধোঁয়ার দেহ খুব কাছে থেকে দেখেছে আমায়। নেকড়ে বাঘ যেমন তার শিকারকে গভীর ভাবে দেখতে থাকে। মাঝে মধ্যে আমার ক্ষতগুলো ব্যথা করে উঠছিল সেই ধোঁয়ার ছোঁয়ায়। কিন্তু সেই ব্যথার মধ্যে মেশানো ছিল বিষের সুখ! অনবদ্য !

একটু পরেই আমার মুখের ওপর এক গোছা চুল এসে পড়ল। আমি এবার চেপে ধরলাম সেই চুলের মুটি। কাঁধের সেলাই এ টান পড়ল। কিন্তু আমরা বস্তির ছেলে । আমাদের ব্যথা লাগেনা। তাই কোনো আওয়াজ করলাম না। নীলচে আলোর আভায় দেখতে পেলাম একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ। কালচে ছটফটে দেহটাকে এবার চেপে ধরলাম আমার কাছে। আমার কাঁধের থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত লাগলো তার চামড়ায়। অনুভব করলাম …

bm il2 - Copy (3)

ফ্যাকাশে আলোর মায়াবী ঘরে নেই মাকর্শার জাল। তবু জালে বন্দি আমি! আমার নীল ঠোঁট আরো বন্য হয়ে ছুঁল তার কপাল। নাক। ঠোঁটের কাছাকাছি আসতেই সাপের ছোবলের মত কামড়ে ধরলাম তাকে। একটু ছটফটানি অনুভব করলাম তার মধ্যে। কিন্তু আমি ছাড়লাম না। বিষাক্ত দংশনে যেন থিতিয়ে গেল সময়। এরপর নিঃশব্দে ওষ্ঠমিলন। 

ঘুলঘুলি থেকে একটু আলো ঢুকে নক্সা বানিয়েছিল দেওয়ালের গায়ে। নক্সাটা হঠাৎ ঢেকে গেল আমার চোখের ওপর পড়া চুলে। আমার জ্ঞান হারালো। তারপর সব কালো। আর কিছু মনে নেই।

এরপর যখন চোখ খুললাম দেখি আমি আমার বস্তির ঘরে শুয়ে। চেনা মাকড়শাটা আমার দিকে তাকিয়ে। আমার মনে আছে আমি সেদিন প্রথমবার চিৎকার করেছিলাম। জানিনা কারুর কানে পৌঁছেছিল কিনা সেই আওয়াজ। কিন্তু সেই নীল ঠোঁটের প্রথম চিৎকারে মিশে ছিল বিষের আত্মকথা।

আরো এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আমি তখনও পুরোপুরি ভাবে সেরে উঠিনি। ইতিমধ্যে সোশ্যাল রেফর্মের স্কুলও বন্ধ হয়ে গেছিলো। তাই দিদির দেখা পাইনি আর।

একটা ধুলোর দিনে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চেষ্টা করেছিলাম দিদির বাড়িটা খুঁজে বের করার। কিন্তু পেলাম না খুঁজে। শুধু বৃষ্টিই এল। রোদ আর উঠলোনা।

মাঝখানে একটা চিঠি পেয়েছিলাম দিদির কাছ থেকে। তাতে লেখা ছিল যে দিদি আমার ভালো চায়। আর ওই রাতের কথাটা যেন গোপন রাখি। দিদির ভাষায় কোথাও যেন একটা দুর্বলতার ছোঁয়া লেগেছিল। পুরোটা পড়ার পর কি মনে হয়েছিল ঠিক ভাবে মনে নেই। তবে সেদিন দিদির চিঠিটা আমার প্রিয় ঘুঁড়িটায় চিটিয়ে উড়িয়েছিলাম। খুব টান দিয়েছিল ঘুঁড়িটা।

সেদিন হয়তো বোঝার চেষ্টা করেছিলাম দিদির মনটা।ভেবেছিলাম দিদির চিঠির উত্তর দেব। লিখতেও বসেছিলাম। কিন্তু কয়েক লাইন লেখার পর বুঝলাম আমার দ্বারা এসব হবেনা। আমরা বস্তির বাসিন্দা। লোকে বলে আমাদের রক্তে অনুভূতি কম। তাই আজও সেই মুচড়ে ফেলা চিঠিটা ঘরের নর্দমায় জল জমায়।

একদিন হঠাৎ হুলো মাঝ রাতে এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বলল “ভাই শুনলাম ওই পাঁচুদার ঠেকের পাশের ঘরটা নাকি একটা নতুন বোবা মাল ভাড়া নিয়েছে। চল দেখে আসি একবার মালটা কে”। আমি বেরিয়ে পড়লাম হুলোর সাথে।

ঘরের সামনে গিয়ে দেখি দরজা খোলা। ভেতরে একটা মোমবাতি জ্বলছে। ভেতরে ঢুকলাম। ঘরে নেই কেউ। শুধু টেবিলের ওপরে একটা ডায়েরি রাখা। চিনতে পারলাম এটা দিদির ডায়েরি। কিন্তু দিদিতো বোবা ছিলনা। দিব্বি কথা বলতো! এরা তাহলে বোবা কেন বললো? হুলোকে বোঝালাম। হুলো তো প্রথমে বিশসাস ই করছিলনা। তারপর একটু ভেবে বললো “কে জানে বোবা হওয়ার নাটক করছে কিনা। লোকজনের হুজুগের তো অভাব নেই!”

আমার মনে পড়ে গেল সেই রাত্রের কথা। মনে পড়ল দিদির মুখটা। সেই ঝাপসা আলোয় দেখা ঠোঁট। মহাভারত পড়িনি, কিন্তু গান্ধারীর কথা শুনেছিলাম।

দিদির ডায়েরীর শেষ পাতাটা খুলে পড়লাম : “আমি ভালোবাসি যাকে। সে বিষাক্ত মানুষ। … নীলাভ তার ঠোঁটে, সাপের ছোবল!

নীল রঙ হল ভীষণ প্রিয়

 

ট্রেন তখন ঝড়ের বেগে ছুটে ছলেছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মায়াবী শূন্যতা ভেদ করে। আমার মন ছুটেছে তার পিছু পিছু। মুম্বাই-গামী দুরন্ত একস্প্রেস। চারপাশে গ্রামিন সৌন্দর্য‍্যের বাহার। তখন প্রায় বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে। আকাশে খেলা করছিল টুকরো টুকরো মেঘ। দূরে নাম না জানা গাছ গুলোর দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা ভেঙ্গে ছুটে চলেছি। আকাশে ফিকে হয়ে আসা রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। হাল্কা আমেজের এলোমেলো অন‍্যমনষ্কতায় ভরে উঠছিল সময়। হঠাৎ ছোখ পড়ল দূরের আকাশের দিকে। দেখলাম কিছু নবাগত মেঘের সারি আকাশের একটা কোণের আংশ জবর-দখল করে বসে আছে। কিছুক্ষণের মধ‍্যেই তাদের আধিপত‍্য ছড়িয়ে পড়ল  সারা আকাশে। মনে হচ্ছিল কোন বিরাট শিশু যেন আকাশে ধুষর মাটি নিয়ে খেলা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনুভব করলাম চারিদিক একটা গভীর স্তব্ধতায় ছেয়ে গাছে। মন ভরেছে রোমাঞ্চে। প্রতিটি বৃক্ষ‍ যেন প্রকৃতির মহারাজার পদার্পণের ভয়ে তটস্থ। সেই অনুভূতি যেন শব্দে ব্যাক্ত করার অতীত। সাহিত্যের সীমারেখা শেষ হয়ে গাছে। এ যেন শুধু অনুভূতি আর অনুভূতি!

খামখেয়ালী-পনায় সাধারণ মানুষকে চিরকাল-ই আমি টেক্কা দিয়ে এসেছি। তাই সাভাবিক ভাবেই আমার ভেতরের খামখেয়ালী সত্ত্বাটা এই অদ্ভুত সৌন্দর্য‍্যের মায়ায়  আবার জেগে উঠেছিল। দিগন্ত বিস্তৃত ছোট ঘাস, মাঝে মাঝে বুকে ব্যাথা নিয়ে অপেক্ষা করা  বাবলা গাছ, মিশমিশে ঘন মেঘ আর গভীর স্তব্ধতায় ভরা বাতাস। নাহ! আর আটকানো যাচ্ছেনা নিজেকে। এই পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পন না করার ধৃষ্টতা আমার পাগল মনের নেই! যে করেই  হোক ট্রেন থেকে নেমে এইখানে কিছুক্ষণ কাটাতেই হবে।

নোএতিক্স নামক প্যারাসায়েন্স-এর একটি শাখা আছে। তার মূল বক্তব‍্য হল যদি কেউ খুব মনে প্রাণে কোন ঘটনা ঘটার জন্য কামনা করে, তাহলে সেটা ঘটার সম্ভবনা বেড়ে যায়। আমার খেত্রেও কতকটা তাই-ই হল। কাছেই একটা ষ্টেশন এসে পড়ল এবং ট্রেনটাও যেন আমার জন‍্যই কোন অজ্ঞাত কারণে দাঁড়িয়ে পড়ল ষ্টেশনে। আর আমায় রাখে কে! পিঠের আর হাতের ব‍্যাগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লাম।

ষ্টেশনের নাম বাস্তাবপুর। প্রত্যন্ত গ্রামের অনামি পরিত্যক্ত ষ্টেশন। প্ল‍্যাটফর্মটা বেশ নিছু আর ভাঙাচোরা।বহুকাল পূর্বের করা কংক্রিট গুলো এখন যেন ফোকলা দাদুর মতো ঈট-পাথর বার করা চেহারায় হাসছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘাসের ছোপ আর অনাদরে বেড়ে ওঠা বুনো ঝোপের সারি। এরাই বোধহয় এই নিভৃত ষ্টেশনের একমাত্র সঙ্গী। সব মিলিয়ে কেমন একটা অদ্ভূত সুন্দর পরিবেশ।

ট্রেনটা ষ্টেশন ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ে ট্রেনের যাত্রীরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমিও মিষ্টি হেসে তাদের হাত নাড়লাম। ট্রেনটা ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে যেতেই ষ্টেশনের প্রকট শূন্যতাটা অনুভব করলাম। চত্বরটা প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। বেশ কিছুটা দূরে ষ্টেশনের শ্রমিকদের  একটা আপরাহ্ন আড্ডা বসেছে। আশেপাশে কয়েকটা আনকোরা কুকুর খেলা করছিল। পিছনে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায় ছোট বড় গাছের শ্যামলা আভরন। চারধারটা দেখতে দেখতে একটা অন‍্যরকম দৃশ্য ছোখে পড়ল। ষ্টেশনের একপ্রান্তে নীল রঙের পোশাক পরে কেউ দাঁরিয়ে। দূর থেকে রংটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম নীল রঙের শাড়ি পরে দাঁ‍‌ড়িয়ে একটি অল্প বৈশী মেয়ে। চেহারায় যেন একাকিত্ত মাখা। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। হালকা হওয়ায় আঁচলএর শেষ ভাগটা এদিক ওদিক নড়েচড়ে খেলা করছিল। একটু অবাক হয়েই এগিয়ে গেলাম। আমি কাছাকাছি আসতেই তার দৃষ্টি আমার চোখে এসে  পড়ল। এইরকম দৃষ্টিপাতে অনভ‍্যস্ত হওয়ার দরুন আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তার চোখের কোণে যেন একটা সরল চাঞ্চল‍্য উঁকি মারছিল। তবুও মায়াময় সেই অনিমিখ চাহনি।

সেই এক পলকের চাহনিই যেন আমার মনটাকে পাগল করে দিল। অদ্ভুত এক মিষ্টি হাসির ইঙ্গিত ছিল তার ঠোঁটের কোণায়। কাঠের পুতুলের মত অসহায় আত্মসমর্পণ করলাম মুহূর্তটার কাছে। এইরকম আরো কিছু অপ্রস্তুত মুহূর্তের পর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম : “নমস্কার। আমার নাম আকাশ। আপনি কি এই জায়গাটা চেনেন?”
মেয়েটি বলল : “নানা আমিও এখানে প্রথম আসছি। আর আমার নাম বৃষ্টি। তা আপনি কোথা থেকে আসছেন?”

তার কথা গুলো যেন একটাও বুঝতে পারলাম না! আমার তখন সমস্ত মনোযোগ তার চোখের গভীরতায় আত্মহারা। তার প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব। কিন্তু কি যে বলব সেটা কিছুতেই ঠাওর করে উঠতে পারছিলাম না। খুবই একটা অস্বস্থিকর পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছিল। কিন্তু শেষমেষ তা আর হলনা, কারণ হঠাৎ যেন আমার মনে হতে লাগল আমার কাঁধে হাত দিয়ে কেউ আমায়  পিছন থেকে ডাকছে। পেছনে মাথাটা ঘোরালাম। আমার যেন বিশ্বাস হল না।

দেখলাম আমি ট্রেনের সাইড আপ্পার বার্থে শুয়ে আছি আর প‍্যান্ট্রিকারের কর্মি আমার সামনে তুলে ধরেছে বিকেলের চা-এর কাপ। 

হায় রে! এ কি তাহলে স্বপ্ন ছিল? চা-এর কাপটা নিয়ে উপরের বার্থ থেকে নীচে নেমে পড়লাম। চোখ পড়ল জানলার দিকে। কি আশ্চর্য! এ তো স্বপ্নে যা দেখেছি পুরো তাই! 

বিস্তৃত নিস্তব্ধ ঘাসভূমি, ধূষর মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশ! আমার ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি। হাল্কা ঝাঁকুনি হাওয়ায় বুঝতে পারলাম ট্রেনটা ব্রেক কষেছে। আর কয়েকবার ঝাঁকুনির পর ট্রেনটা পুরোপুরি থেমে গেল। সহযাত্রীরা কেউ কেউ  বলল : “কেউ হয়তো চেন টেনেছে। “ 

আমি আর দেরি করলাম না। তাড়াতাড়ি নিজের ব‍্যাগপত্র নিয়ে নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে। একটু পরেই ট্রেনটা আমায় ফেলে বেরিয়ে গেল। লাইনের উপর মিলিয়ে যাওয়া ট্রেনটার আওয়াজ যেন অনেক্ষন কানে লেগেছিল। তাকালাম চারধারে। আকাশ জুড়ে মেঘের গম্ভির আবেশ আমার মন কে ছেয়ে ফেলেছিল। আবার যেন অনুভব করলাম সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত সৌন্দর্য‍্যের হাতছানি। সেই অনবদ‍্য অনুভূতির ঝিনুক কোড়াতে কোড়াতে ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে এগোতে থাকলাম। 

যেতে যেতে ভাবছিলাম স্বপটা কি শুধু স্বপ্নই ছিল? আমার মন কিন্তু বলছিল ওটা যেন শুধু স্বপ্ন নয়, ওটা ভবিষ্যতেরই পূর্বাভাস। কোথায় যেন পড়েছিলাম স্বপ্নেরা আমাদের চাপা পড়ে যাওয়া কামনা ও আতঙ্কের প্রতীকী রূপ। তারা ছন্নছাড়া, বাঁধনহীন। প্রায়শই তারা কিছু গোপন গভীর অনুভূতির উন্মেষ ঘটায়। স্বপ্নের স্মৃতিরা নরম ও আবছা। কিন্তু আমার মনের ভিতর নীল দাগটা তখনও স্পষ্ট আর গভীর। 

পাশের একটা ঝোপের কোনায় একটা কালো মাকড়সা নড়াচড়া করছিল। তার পিঠের ওপরে একটা ছোট্ট নীলচে নক্সা। নীল বিপদসংকেত? 

 
এইসব ভাবতে ভাবতে কেন জানিনা মনটা একটু  ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। দূর দিগন্ত থেকে ফিরে আসা পাখির ডানার ক্লান্তি ঘনিয়ে উঠছিল মনের আনাচে-কানাচে। মনে মনে ভাবলাম, নাহ! একটা সাধারন স্বপ্নকে এতটা পাত্তা দেওয়া উচিত হচ্ছে না।  এইসব এলোমেলো চিন্তা মাথা টাকে একদম ভরিয়ে তুলেছিল। হঠাৎ কিসে যেন জোরে ধাক্কা খেলাম! মাথায় বেশ লাগল।অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁঠতে হাঁঠতে আমি বুঝতেই পারিনি যে আমি একটা ষ্টেশনের এত কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। চোখ খুলে দেখলাম ধাক্কা খেয়েছি ষ্টশনের নাম লেখা একটা বড় সাইনবোর্ডে। 

সাইনবোর্ডে বড় বড় করে নীল অক্ষরে লেখা : স্বপ্নপুর! 

নীল রংটা যেন আমার ব্যাথাটাকে আরো গভীর করে তুলল। 

হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। 

বৃষ্টি নামল বুকে। 

বৃষ্টি নামল চোখে। 

কিন্তু বৃষ্টির আওয়াজের মধ‍্যেই যেন কেউ পিছন থেকে বলে উঠল : “আপনার লাগেনি তো?” 

যুবতী কন্ঠস্বর! 

আমার হাসিও পেল। 

অকারণ হাসি। 

কাতুকুতু হাসি। 

 পিছনে ফিরে জলে ভেজা ঝাপসা চোখে দেখলাম একটু দুরে একটা নীল ছায়া মুর্তি।  

আমার যেন বিশ্বাস হল না!

 

 

a - Copy - Copy

 

(চিত্র : চিত্রম )