লুই ও আশ্চর্য্য বেড়াল

সাল ১৮৮৪। কোনো এক দিন।

বেজায় বৃষ্টি। সঙ্গে ছাতাও নেই লুই এর। গা মুছবার জন্য রুমালটা বের করতে যাবে, অমনি শুনল “ম্যাও!” কি আপদ! এই বৃষ্টিতে ম্যাও করে কে?

লুই দেখল তার পকেটে রুমালটা আর নেই, আর সামনে একটা অপুষ্টিতে ভোগা, রোগা সাদা কালো বেড়াল গোঁফ ভিজিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

লুই বলল , ” কি মুশকিল! ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল!”

ওমনি বেড়ালটা বলে উঠল, ” মুশকিল আবার কি? ছিল প্রজা, হয়ে গেল দিব্বি একটা মোটাসোটা রাজা। এ তো হামেশাই হচ্ছে। হ য ব র ল পড়নি?” একটু ভেবে লুই বলল  ” নামটা তো শোনা শোনা লাগছে, কিন্তু তুমি পড়েছ?”

বেড়াল বলল “হ, য, ব আর র পড়েছি, কিন্তু ল (law) টা পড়া হয়নি। সেটা পড়লে কি আর বেড়ালদের দুনিয়ায় এত অনাচার হতে দিতাম? আমি ল পড়লে পৃথিবীতে শুধু একটাই ল থাকত: ‘বেড়ালকে দুধ খাওয়াও’; এত দুধ খাওয়াও যাতে ওর শেষ দিন পর্যন্ত নাক টিপলে দুধ বেরোয়, যাতে ও দুধের মধ্যে সাঁতার কেটে বেড়াতে পারে, ইচ্ছামৃত্যু হিসেবে দুধেলসমাধি বেছে নিতে পারে..। ” বলতে বলতে বেড়ালের চোখে জল চলে এল। (বাস্তববাদী পাঠকেরা চোখের জল না ভেবে বৃষ্টির জলও ভাবতে পারেন)।

লুই বেড়ালটাকে থামিয়ে বলল “কিন্তু তুমি তো সত্যিকারের বেড়াল নও, আসলে তুমি রুমাল, তাহলে তোমায় কি বলে ডাকব?”

বেড়াল বলল “বেড়াল বলতে পারো, রুমাল বলতে পারো আবার চিটারও বলতে পারো।” লুই বলল “চিটার কেন?”

শুনে বেড়ালটা “তাও জানো না?” বলে চোখ বুজে গান ধরল “চিটার পিটার মগজ মিটার গেছো দাদার রঙিন  গিটার ..”

লুই বেড়ালটাকে থামিয়ে বলল “আচ্ছা তোমার নাম তাহলে পিটার। এখন তুমি গেছো দাদার গল্প ছেড়ে আমার সাথে চল। বাড়ি গিয়ে বাকি কথা হবে না হয়।”

hjbrl
সুকুমার রায়ের “হ য ব র ল”-এর বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – সত্যজিত রায়।

পিটারকে সঙ্গে করে ঘরে ফিরল লুই। এমিলি(গিন্নি) ভেজা লুইকে দেখে বলল “এতবার বলি ছাতাটা নিতে ভুলে যেওনা, একটা কথাও মনে রাখনা।” লুই এমিলির কথায় কান না দিয়ে উৎসাহ ভরে বলল “দেখ গো কাকে এনেছি আজকে। একটা কথা-বলা বেড়াল!” তারপর পিটারের দিকে তাকিয়ে বলল “তোমার যে এত প্রশ্ন, সব এমিলিকে করবে, কেমন?”

ভেজা বেড়ালটা শুধু করুন মুখ করে বলল “ম্যাও, ম্যাওও”। এমিলি পিটারকে দেখে বলল “ও মা, বেচারা ভিজে কাক হয়ে গেছে। ওকে একটু গরম দুধ দি।”

লুই ব্যস্ত হয়ে বলল “কিন্তু ও জানোতো সত্যি কথা বলে।” এমিলি পিটার কে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল “ওটা তোমার মনের ভুল। পরের মাসে তোমার আঁকা ছবিগুলো ভালো বিক্রি হলে তোমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”

লুই মুখ কালো করে পিটারের ভেজা লোমগুলো দেখছিল আর ভাবছিল বেড়ালদের দুনিয়ায় সত্যিই কত দুর্ভিক্ষ, কত অনাচার।

সাল ১৮৮৬। এমিলি কর্কট রোগে আক্রান্ত। লুই এমিলির সেবায় মগ্ন।

বিকেলবেলা বিছানায় শুয়ে জানলার বাইরে একটা গাছের পাতার দিকে তাকিয়েছিল এমিলি। শীতের আবির্ভাবে গাছের পাতা গুলো ঝরে ঝরে পড়ছিল। পিটার এমিলির পাশে বসে মন দিয়ে নিজের লোম চাটছিল। লুই কাছে একটা টেবিলে পিটারের ছবি আকছিল।

লুই চিন্তিত কপালে খাট এর পাশে এসে এমিলিকে বলল “এভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে কি ভাবছো? এই দেখো আমি কি এঁকেছি।” বলে লুই তার আঁকা পিটারের ছবিটা দেখালো। এমিলি যেন শুনতেই পেলনা কথা গুলো। মাছের মতো চোখ করে নিষ্পলকে তাকিয়ে ছিল জানলার দিকে। লুই এবার বলল “এমিলি, জল খাবে?” এমিলি এবার পাশ ফিরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। লুই একটা পুরোনো কাঁচের গ্লাসে জল এনে পাশের টেবিলের উপর রেখে বলল “এই নাও জল।” তারপর লুই উঠে গিয়ে আরো কিছু আঁকা এনে এমিলিকে দেখাতে থাকল “এই দেখ, এটা হল পিটারের গোফ ভিজিয়ে দুধ খাওয়া। এই ছবিটায় পিটার গামছা পরে চান করছে।…” বলতে বলতে লুই নিজেই হাসছিল। লুইকে হাসতে দেখে এমিলির ঠোটেও হাসি টিমটিম করল। লুই এমিলিকে ছবি গুলো দিয়ে বলল “তুমি দেখো, আমি তোমার জন্য আরো ছবি আকছি। আর জলটা খেয়ে নিও।” এমিলি আর্ত স্বরে বলল “খাচ্ছি একটু পরে।” লুই আবার আঁকতে লাগল।

bathing
বেড়ালের স্নান করার চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

হঠাৎ ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার আওয়াজ হল। টেবিলের উপর রাখা জলের গ্লাসটা মাটিতে ভেঙে চৌচির। চারধারে কাঁচের টুকরো আর ঘরের একদিকটা জলে থৈথৈ করছে। পিটার খাট থেকে টেবিলে লাফানোর সময় কিছুভাবে তার গায়ে লেগে গ্লাসটা মাটিতে পড়ে গেছিল। এটা দেখে লুইএর মাথাটা হঠাৎ খুব গরম হয়ে গেল। হাতের কাছে আরেকটা গ্লাস ছিল। সেটা তুলে লুই গায়ের জোরে ছুঁড়ে মারল পিটারের দিকে। পিটার নিমেষে ছুটে ঘরের বাইরে মিলিয়ে গেল। লুই চিৎকার করে বলল “শয়তান বেড়াল, আজকে তোর খাওয়া বন্ধ।”

এমিলি খুব দুঃখ পেল লুইএর আচরণে।

ঘর থেকে বেরোনোর পথে ভাঙা কাঁচের টুকরোয় পা পড়ে পা কেটে গেল লুইয়ের। কালো ঘরে থমথমে নিস্তব্ধ সন্ধ্যা নামল।

সাল ১৮৮৭। মৃত্যুপর্ব ১।

বছর শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যু হয় এমিলির। লুইএর ছবিতে নতুন সত্ত্বার প্রভাব পাওয়া যায় আজকাল। তার ছবিতে একের পর এক বেড়াল ঘুরে বেড়ায়। বেড়ালরা ছবিতে জামা কাপড় পরে, রেস্তোরাঁ এ যায়, গিটার বাজায়, আবার কোনো বেড়াল এক গুচ্ছ গোলাপও সাজায়।এমিলির প্রাণ স্পন্দন বারবার ধরা দেয় রং পেন্সিলে গড়া পিটারের ছায়ায়।

roses
বেড়ালের গোলাপ সাজানোর চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

যেন এক পাগল প্রেমিকের প্রলাপের গোলাপ উৎসর্গ পরোলোকের প্রেমিকার প্রতি।

সাল ১৮৯৮। মৃত্যুপর্ব ২।

মৃত্যু ঘটে পিটারেরও। এমিলিকে লুই পিটারের প্রাণবনতায় আঁকড়ে ধরে রাখত। পিটারের মৃত্যুর পর সেই প্রানের রং মিশতে থাকল লুইএর আকায়।

sad
বেড়ালের পেন্সিল স্কেচ। শিল্পী – লুই ওয়েন।

প্রাণ সর্বদা রঙিন নয়। কালো কল্পনার রংয়েও রাত্রি ঘনাত নোটবুকে।

সাল ১৯২৩। মৃত্যুপর্ব ৩,৪ ও সিজোফ্রেনিয়া।

জলে ডুবে যেতে থাকা মানুষের প্রাণ ফিরে পাওয়ার উদ্যম এক সময় থিতিয়ে যায়। লুইও বিষাদে ডুবতে ডুবতে সমুদ্রতল ছুঁয়ে ফেলে যখন তার মা(১৯১০) ও বড় বোনের(১৯১৭) মৃত্যু হয়।

লুইএর মনের নানান আগাছায় এবার সন্দেহের ফুল ফোটে। সেই ফুলের বিজ্ঞান সম্মত নাম সিজোফ্রেনিয়া। সেই ফুলের হরেক রূপ!

একদিন সকাল সকাল বাড়িতে এক অদ্ভুত গম্ভীর আওয়াজ হতে আরম্ভ করে। বিকট আওয়াজে চারধারে কানে তালা লাগে। একটু পরেই পাড়া প্রতিবেশী ও ঘরের বাসিন্দারা অবাক হয়ে আবিষ্কার করে লুইএর কীর্তি। লুই তার ঘরের সমস্ত আসবাব, কাঠের আলমারি, খাট, সব এদিক ওদিক সরিয়ে একাকার করছে। কোনো অজ্ঞাত অদৃশ্য শত্রুর সন্ধানে। অদৃশ্য শুত্রু তবুও লুকিয়ে থাকে লুইএর মনের সন্দেহ-নীড়ে।

আরেকবার লুই বড় পর্দায় ছায়াছবি দেখতে যায় বোনেদের সাথে। ছবি শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই লুই “ইলেক্ট্রিসিটি, ইলেক্ট্রিসিটি” বলে মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। তার মনে হতে থাকে পর্দা থেকে বিদ্যুৎ যেন ফেটে বেরিয়ে তাকে আঘাত করছে। সেদিন রাত্রে লুইএর সংগ্রহে যুক্ত হয় “দা ইলেকট্রিক ক্যাট” নামক চিত্র।

সন্দেহ ফুলের আরেক কলি ফুটে ওঠে যখন লুই তার বোনেদের দোষারোপ করা শুরু করে তার থেকে টাকা চুরি করার কারণে। সেই অজুহাতে লুইএর চরিত্রে হিংসাত্মক বিবর্তন দেখা দেয়। লুইএর মনে সেই বাড়ন্ত গাছ পরিপূর্ণতা লাভ করার আগেই তার বোনেরা লুইকে ভর্তি করে এক মানসিক হাসপাতালে।

an electric cat
বৈদ্যুতিক বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

লুইএর মানসিক সম্যতা তবুও আলেয়া হয়ে ঘুরে বেড়ায় ছায়াছবির বৈদ্যুতিক পর্দায়।

সাল ১৯২৫। বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ।

মানসিক চিকিৎসালয়ে লুই এর দিন কাটে বেড়ালের ছবি এঁকে। কিন্তু তার চিত্র-শৈলীতে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। তার ছবিতে দিন দিন বেড়ালের চোখ আরো উজ্জ্বল, দীর্ঘ ও প্রস্ফুট হয়ে উঠতে থাকে। বেড়ালের আকৃতিতে বিমূর্তির পরশ লাগে। উজ্জ্বল রঙিন জটিল নকশা ঘিরে ফেলে বেড়ালের মাংস পেশি। এক রহস্যময় সাইকেডেলিক অভিব্যক্তির সঞ্চার ঘটে তার চিত্রকলায়।

17
বিমূর্ত বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

স্মৃতি, কল্পনা , প্রকৃতি আর প্রানের সংমিশ্রনে যেন সৃষ্টি হয় পাগলাগারদের মোনালিসা!

(এই ছবি গুলোর সৃষ্টিকাল বিতর্কিত)

উপসংহার

উপেরের লেখাটি বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট চিত্রকার লুই ওয়েনের জীবনী অবলম্বনে কল্পিত। অল্প বয়সেই লুই সিজোফ্রেনিয়া (বিতর্কিত) নামক এক মানসিক রোগের শিকার হন। কিন্তু তার আঁকা অগুন্তি বেড়ালের চিত্র বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে তৎকালীন ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সময়কালে একের পর এক দুর্ঘটনার আবৃতি ও আর্থিক দুরবস্থা লুইএর মানিসিক ভারসাম্যর অবনতি ঘটাতে থাকে। ফলস্বরূপ এক অদ্ভুত হিংসাত্মক মনোভাবের বিকাশ ঘটে তার চরিত্রে। তাইতাকে পাঠানো হয় এক মানসিক চিকিৎসালয়ে। সেখানেও লুই ছবি আকতে থাকে এবং লুইয়ের ছবিতে এক আধুনিক বিমূর্ত ধারা প্রকাশ পায়। লুই এর শেষ জীবন কাটে মানসিক হাসপাতালের গন্ডিতেই। লেখক এইচ. জি. ওয়েলসের লুই ওয়েনের সমন্ধে এক উক্তি : “He made the cat his own. He invented a cat style, a cat society, a whole cat world. British cats that do not look and live like Louis Wain cats are ashamed of themselves.”

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে জ্যাকসন পোলক ও প্রমুখ চিত্রশিল্পীর সৃষ্টিতে বিমূর্ত অভিব্যক্তির(abstract expressionism) ধারা সাড়া ফেলে চিত্র জগতে। কিন্ত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাগলাগারদে বন্দী বেড়ালের বিমূর্ত অভিব্যক্তি সেই তুলনায় রয়ে যায় উপেক্ষিত।

psyche
সাইকেডেলিক বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

বেড়ালদের দুনিয়ায় সত্যিই কত অনাচার! 

তথ্যসূত্র

1. V. Adrian, “100 Years of Traditional British Painting”, London : David and Charles, 1989.

2. S. Denham, “The Man who Drew Cats.”, The Guardian (newspaper), Aug. 5, 1960.

3. A. McGennis, “Louis Wain: His Life, His Art and His Mental Illness.”, Irish Journal of Psychological Medicine, vol. 16, no. 1, 2014, pp. 27-28.