ক্যাপাসিটর

জম্পেশ করে তেল দিয়েছি চুলে। চপচপ করছে। বাঁ পাশে যত্ন করে করা শিথেটা জিওমেট্রি বক্সের স্কেলের থেকেও সরল। কপালের ওপর চুল গুলো চিরুনি দিয়ে চেপে বসানো। পরিষ্কার ভাবে দাড়ি কামিয়েছি। সাথে মনে রেখেছি, ঝুলপি কানের নীচে যেন না নামে। চোখে একটা বিনা পাওয়ারের রিমলেস চশমা পড়েছি। উঁচু কলারের একটা ভদ্র রঙের ফর্মাল শার্ট পড়েছি যাতে ঘাড়ের কাছের ক্যাপাসিটর ট্যাটুটা না দেখা যায়।

এরপরও বারবার আয়নায় নিজেকে দেখে জিজ্ঞেস করেছি, ঠিক লাগছে তো?

উঁহু। চোখের চাহুনি টা আর একটু নরম করো।

এবার?

এবার চোখটা হালকা একটু ছলছলে করার চেষ্টা করো।

এবার?

আরেকটু।

ধুর, আর পারছিনা। যা হয়েছে হয়েছে।

আমার সাধের লাল ক্যাপাসিটরটা সুক করে একবার স্নর্ট করে বেরিয়ে পড়লাম।

যাওয়ার সময় বাড়ির উল্টো দিকের ছোট মন্দিরটায় গিয়ে বললাম ঠাকুর মশাই, আমায় একটা চন্দনের ফোঁটা দেবেন?

উনি খালি গায়ে ধুতি পরে কিছু একটা জপ করছিলেন। আমার কথা শুনে একবার পিছনে ফিরলেন, কিন্তু কোনো কথা বললেন না। হাত দেখিয়ে বসতে বললেন। আমি বুঝলাম ওনার জপ শেষ না হওয়া পর্যন্ত উনি অন্য কিছু করবেন না। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছিল, তাই আমি ওনার সামনে থেকে চন্দনের বাটিটা তুলে টুক করে কড়ে-আঙ্গুল দিয়ে নিজের কপালে একটা টিপ বানিয়ে নিলাম। উনি আমায় দেখে হতভম্ব হয়ে “ওই কি করছো, ওই!” বলে উঠলেন। আমি শুরুৎ করে মন্দির থেকে বেরিয়ে ছুটলাম। আর বেরোনোর সময় বললাম খুব জরুরি কাজে যাচ্ছি ঠাকুর মশাই, আপনার আশীর্বাদটা করে দেবেন।

এরপর মিষ্টির দোকান। আমাদের চত্বরে সবচেয়ে নাম করা দোকান হলো প্রস্তাব মিষ্টান্ন ভান্ডার। খুব ভিড় থাকে। তবে ভিড় এমনি এমনি নয়। এখানকার জল ভরা সন্দেশ সারা উত্তর কলকাতায় নাম করা। দেখলাম এবার আবার এরা নতুন ট্যাগ-লাইন বানিয়েছে: খান , গলে যান, সম্মতি জানান।

আমি ভিড় ঠেলে অনেক কষ্টে এক বাক্স জল ভরা সন্দেশ নিলাম।

এরপর লোকাল ট্রেন। ভিড় থাকতে পারে বলে মনে করে অনেকটা ফচ-ফচ মেরে এসেছিলাম। কিন্তু সেরম ভিড় ছিলোনা ট্রেনে। দেখতে দেখতে চলে এল নামার স্টেশন।

তারপর বাসে যাত্রা। ভিড় বাসে দুটো মোটা লোকের মাঝখানে প্রায় চিড়ে চেপ্টা হতে হতে অবশেষে এসে পৌছালাম আমার গন্তব্যে।

এরপর এলো সবচেয়ে কঠিন কাজটা। বাড়িটা খুঁজে বের করা। ঠিকানা জানিনা।

একটু এগিয়ে দেখলাম একটা সবজির বাজার মতো বসেছে। সেখানে এক লাউওয়ালাকে জিজ্ঞেস করলাম, দাদা নায়েকদের বাড়িটা কোথায় জানেন?

প্রথমে সে বলল : ক্যা? ক্যা কন?

আমি: নায়েকদের বাড়ি চেনেন?

লাউ: আমি কেবল লাউ এর চাষ কথা হয় বলতে পারি বাবু। লায়েক কথা পাবো? আপনি ওই লগের বেগুনওলা কে জিজ্ঞেস করেন। উনি হরেক জিনিস জানেন বটে।

গেলাম বেগুনওলার কাছে।

আমি: দাদা ওই নায়েক দের বাড়ি কোথায় জানেন?

বেগুন: আপনি ওনাকে খুঁজছেন কি যে রোজ আমার লাইগা বেগুন খরিদ করে? হ্যাঁ চিনি তো ওনাকে।

আমি: আমি জানিনা উনি বেগুন কেনেন, না মাথায় মাখেন। ওনার পদবি কি নায়েক?

বেগুন: তাই হবে মন হয়। দেখতে তো নায়ক নায়ক বটে। আমি বইলা দিসি আসুন। আপনি এই রাস্তা ধরে চলতে থাকেন। কাউকে জিজ্ঞাসা করেন কি করলা বিদ্যা মন্দির কোনখানে। যেভাবে যেতে বলবে যাইবেন। তারপর ওখানে গিয়া জিজ্ঞাসা করবেন।

আমার লোকটার কথা খুব একটা ঠিক বিশ্বাস হলনা। গুগুল ম্যাপ এও এই উচ্ছে বা করলা কোনো বিদ্যা মন্দিরের খোঁজ পেলাম না। অনেক ঘোরাঘুরির পর একটা হুলো বেড়ালের মতো দেখতে লোককে আবার মিনতি করে বললাম: দাদা করলা বিদ্যমন্দির যেতে চাই। একটু সাহায্য করবেন?

লোকটা প্রথমে একটু হাসলো। তারপর বলল: এখানে একটাই ইস্কুল আছে । জামালপুর বিদ্যমন্দির। সেই ইস্কুলের হেডমাস্টার একদিন একটা গাড়ি কেনেন। টয়োটা করলা গাড়ি। সেই গাড়ি চড়ে তিনি ইস্কুলে আসতেন। সেই থেকে ইস্কুলের নামই হয়ে যায় করলা!

আমার একটু ভরসা হল। আমি বললাম: আপনি নায়েকদের বাড়ি চেনেন?

লোক: ও, আপনি নায়েক-বাড়ি খুঁজছেন? আগে বলবেন তো। …

ওনার নির্দেশ বরাবর পৌঁছে গেলাম একটা বড় লাল বাড়ির সামনে।

বাইরের গেটটা খুলে ঢুকে বাগান পেরিয়ে বাড়িতে প্রবেশ করার দরজার সামনে এসে কলিং বেল বাজালাম।

ভেতর থেকে একটা মহিলার গলা শোনা গেল: পুতুল, দেখতো কে এল।

একটু পরে খুলে গেল দরজা। একজন মহিলা আমায় প্রথমে এক ঝলক দেখলেন। তারপর চিনতে না পেরে জিজ্ঞেস করলেন: কাকে চান?

তার এক হাতে তখনো রান্নার খুন্তি ধরা।

আমি বললাম: বিহঙ্গ বাবু আছেন? একটু ওনার সাথে কথা বলতে এসেছিলাম।

মহিলা: আসুন।

আমি পেছন পেছন গেলাম।

মহিলা: ওখানে বসুন।

আমায় বসার ঘরে বসিয়ে দিয়ে রান্না করতে চলে গেলেন যিনি দরজা খুলেছিলেন।

আমি বসলাম একটা চেয়ারে গুটি সুটি হয়ে।

চারধারে সমস্ত আসবাব পুরানো আমলের সেগুন কাঠের তৈরি। সিলিং এ করিকাঠ গুলো দেখে বোঝা যায় বাড়িটাও বেশ পুরানো।

রুপোর চামচ মুখে একটা চার পাঁচ বছরের বাচ্ছা বারবার দরজার কাছে ঘোরাঘুরি করছিল আর হাসছিল। বোঝার চেষ্টা করছিল আমি কে।

একটু পরে একজন বলে উঠলো: ডিম, ওদিকে যেওনা। এদিকে এস।

বাচ্ছাটা তাও ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলো। হঠাৎ কেউ একজন ডিমকে কোলে তুলে অন্য দিকে নিয়ে চলে গেল।

আমি ভাবছিলাম, ডিম আবার কারুর নাম হয়? কে জানে, এদের কাছে পাখিদের নাম যদি খুব আদরের হয় তাহলে পাখির  ডিম ও আদরের নাম ই হবে হয়তো।

হঠাত ঘরে ঢুকলেন একজন ভদ্রলোক। কি নাধরকান্তি চেহারা! প্রসস্থ ললাট, উন্নত নাসিকা! বুঝতে অসুবিধা হলনা যে ইনিই নায়েক বাবু।

আমি চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালাম আর নমস্কার করলাম।

উনি আমার দিকে একবার তীক্ষ্ণ ভাবে তাকালেন। তারপর একটু ভুরু কোঁচকালেন, আর বললেন :তোমায় তো ঠিক চিনলাম না।

আমি অল্প হেসে বললাম: এটা কোনো বড় বেপার নয়। আমিও তো আপনাকে চিনতাম ই না যদি আজকে এখানে না আসতাম। ..

উনি চেয়ারে বসতে যাবেন এমন সময় খট করে একটা শব্দ হল। উনি “আউউউ..” করে সেয়ালের মত চেঁচিয়ে উঠলেন।

আমি এগিয়ে গিয়ে দেখার চেষ্টা করলাম কি হয়েছে। উনি বললেন: আরে কিছুনা কিছুনা, পায়ের কড়ে আঙ্গুলটা টেবিলের পায়াতে ঠুকে গেল।

আমি ওমনি ঝুকে পরে ওনার পায়ে হাত দিয়ে বললাম: কই দেখি, লাগেনি তো জোরে?

উনি একটু ইতস্তত হয়ে বললেন: একি করছ, কিছু হয়নি।

আমি বললাম : আপনার পায়ের ধুলোটা নিতেই হত, তাই ।

নায়েকবাবু: না সে ঠিকাছে, কিন্তু তোমায় তো ঠিক চিনলাম না।

আমি: চিনতে আর কতক্ষন , চিনে যাবেন ঠিক। আমি আসলে আপনাকে একটা জরুরি কথা বলতে এসেছিলাম। কিন্তু কাকু, তার আগে আপনি এই মিষ্টির প্যাকেটটা নিন।

নায়েকবাবু: মানে? এ আবার কি? তোমায় চিনিনা জানিনা মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে নেব? এ আবার হয় নাকি?

আমি: কিন্তু কাকু, যে জরুরি কথাটা বলব সেটা তো মিষ্টির প্যাকেট ছাড়া হবেনা। আপনাকে এটা নিতেই হবে। আপনি না নিলে আমি খুব দুঃখ পাবো।

নায়েকবাবু: ঠিকাছে ঠিকাছে, রাখো টেবিলের ওপর।

আমার মুখে হাসি ফুটলো। জ্বলে উঠলো মুখটা।

আমি: এইতো! থ্যাংক ইউ কাকু। লাভ ইউ।

কাকু একটু গম্ভীর ভাবে বললো: এসব লাভ টাভ আমাদের বাড়িতে চলেনা। সাবধান। তুমি এভাবে বললে বলে নিলাম। তার জন্য এত উচ্ছসিত হয়ে যেওনা।

আমি: নানা একদমই নয় কাকু। লাভ কথাটা ভুল করে মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। আসলে আপনি ব্যবসা করেন তো, তাই সকাল থেকেই ভাবছিলাম লাভ কথাটা আপনার সাথে কথা বলার সময় কোথাও একটা ঢোকাতে হবে। কিন্তু কিভাবে ঢোকাব বুঝে উঠতে পারছিলাম না। আপনি মিষ্টিটা নিলেন, আমাদের মিলঝুল হল, ওমনি তিরিক করে মাথায় বাল্ব জ্বলে উঠলো, আর লাভ কথাটা পান হিসেবে ঝেড়ে দিলাম।

নায়েকবাবু: এসব কি বলছো বুঝছিনা ভাই আমি। পান হিসেবে ঝেড়ে দেয়া আবার কি? পানের পিক ফেলা বোঝাতে চাইছো?

আমি: ইশ!কাকুউউউ! আপনি আমায় চিনলেন না। আমি আপনার সাথে পানের পিক ফেলার মতো নোংরা কোনো বেপার নিয়ে কথা বলতে পারি? আমায় দেখে মনে হয়?

আমি করুন মুখ করলাম।

নায়েকবাবু: না সে তোমায় দেখে তো মনে হয়না তুমি পান খাও বা করো। ভদ্র সভ্যই আচার ব্যবহার, কিন্তু এটাও ঠিক যে আমি তোমায় সেভাবে চিনিনা।

আমি: আরে কাকুঊঊ। চাপ নেবেন না। চিনে যাবেন। চিনে যাবেন। ঠিক চিনে যাবেন। একদম চীনের প্রাচীর পেরিয়ে চিনে যাবেন! আপনি আর আমি তো অনেকটা চীন আর ভারতের মতোই, তাই না? হ্যাঁ, হয়তো একটু সময় লাগবে। একটু ধৈর্য চাই। বা একটু খুঁজে নিতে হবে..

নায়েকবাবু: খুঁজে নিতে হবে বলতে?

আমি: মানে এই ধরুন আমার মধ্যে, আমার কথা বার্তার মধ্যে, আমার হাবভাবের মধ্যে, আপনার নিজের আমার বয়সে থাকা কালীন কাটানো সময় গুলোর কথা মনে পড়ে না? সেই চায়ের দোকানে বসে আড্ডা, সেই ভ্যানাদার কচুরির দোকান?

নায়েকবাবু: এই দাঁড়াও দাঁড়াও, তুমি নির্ঘাত গুল মারছ। কারণ আমি চা খাইনা! তবে হ্যাঁ কচুরির দোকান একটা ছিল বটে, সেটাও নুরুল দার, ভ্যানা নয়। সে কি স্বাদ! সেগুলো কি আর ভোলা যায় বাছা!

আমি: হ্যাঁ কাকু। ওই ভ্যানা বলতে নুরুলদাকেই বুঝিয়েছিলাম।

ভেতর থেকে একটা চিৎকার এল: য়‍্যাই তুমি এখনও চানে গেলে না?

নায়েকবাবু একটু তড়িঘড়ি করে বললেন: ভাই, একটু শর্টে বলো, শর্টে। তোমার বক্তব্যটা কি?

হঠাৎ দরজা দিয়ে একজন মহিলা ঘরের ভেতরে ঢুকলেন। অত্যন্ত লাবন্যময়ী । সবুজ রঙের শাড়ি পড়েছিলেন। কিন্তু তাকে দেখব কি, ঝড়ের গতিতে ঢুকেই একটা বাটি টেবিলে রেখে আবার হন্তদন্ত হয়ে বেরিয়ে গেলেন। বেরোনোর সময় বলতে বলতে গেলেন,: বড়াটায় নুন ঠিক আছে কিনা দেখতে বলল কাকিমা।

একবারও আমার দিকে তাকালোই না!

কাকু বাটি থেকে বড়াটা তুলে নিয়ে অর্ধেক করে একটা অর্ধেক মুখে পুরলেন আর আরেকটা অর্ধেক বাটিতে রাখলেন। তারপর আমার দিকে বাটিটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, : খেয়ে দেখো, মাছের ডিমের বড়া। বেশ ভালো হয়েছে।

“এই বোনোমালা..”, হাঁক পাড়লেন কাকু। “চমৎকার হয়েছে বড়াটা। আরেকটা পাওয়া যাবে নাকি? এখন?

ভেতর থেকে কোনো সাড়া এলোনা।

আমি বড়াটা মুখে পুরলাম। অসাধারণ।

কাকু ভুরু নাচিয়ে বললেন,: কি? দারুন না?

আমি মাথা নাড়লাম।

আমি: আর যিনি দিয়ে গেলেন ওনাকে তো ঠিক চিনলাম না।

নায়েকবাবু: ও? ও তো পাখি, আমার মায়ের দেখভাল করে। বলতে পারো আমার মেয়ের মতই।  কিন্তু দাঁড়াও দাঁড়াও! তুমি এমন ভাবে বললে”ওনাকে ঠিক চিনলাম না” , যেন আমার বাড়িতে কতদিনের যাতায়াত! একটু খুলে বলো তো বেপারটা কি!

আমি: কিছুনয় কাকু। বলছি বলছি। আপনি আগে ওই নুরুলদার ঠেকের গল্পটা শেষ করে নিন।

নায়েকবাবু: ঠেক? নুরুলদার কচুরির দোকান ছিল, ঠেক নয়! আর যারা ওসব জায়গায় যায় আমি তাদের একদম পছন্দ করিনা। তুমি যাও নাতো?

আমি: নানা কাকু, আমার তো বাড়িতেই গাছ আছে, ওসব নোংরা জায়গায় কেউ যায় নাকি? আমি ‘গাছ লাগান প্রাণ বাঁচান’ বা ‘পাতা বাঁচান’ এই সবেই বেশি বিশ্বাসী।

নায়েকবাবু: ও তুমিও গাছ করো? আমার ও জানো খুব গাছ করার শখ। গত সপ্তাহেই বেশ কয়েকটা বনসাই এনেছিলাম। তবে শুকিয়ে যাচ্ছে কেমন একটা।

আমি: আরে কাকু, এ জমানায় বনসাই টনসাই কেউ লাগায় নাকি? আমি আপনাকে সব গাছের পিতৃ গাছ এনে দেবো।

নায়েকবাবু: সেটা কি গাছ বলোতো? পিতৃ গাছ বলে তো কোনো গাছ শুনিনি।

আমি: বুঝলেন না, বাবা গাছ। বাবা।

নায়েকবাবু: না ভাই, এই গাছের কথা শুনিনি। মালীকে জিজ্ঞেস করে দেখবো তো। তো তুমি এরপর যবে আসবে একটু এনে দেখিও তো।

আমি: হ্যাঁ কাকু, নিশ্চই। তবে একটা প্রশ্ন ছিল কাকু। যদি অপরাধ না নেন করতে পারি?

নায়েকবাবু: হ্যাঁ, বলো, এত কথা যখন বলছি এই প্রশ্নটাও করেই ফেল।

আমি: আচ্ছা, আপনি আপনার কলেজ লাইফে কখনো নেশা করেছেন? মানে আমি শুনেছি নেশা টেশা করলে নাকি নতুন চিন্তা ভাবনা মাথায় আসে, সৃজনশীলতা বাড়ে, গবেষকেদের গবেষণার একটা মুখ্য উপাদান নাকি নেশা দ্রব্য?

নায়েকবাবু: এসব কি বলছো তুমি? শোনো, আমার মনে হয় তুমি একটু অন্য দিকে চলে যাচ্ছ।

আমি: নানা কাকু, আমি এগুলো আমার কিছু বন্ধুদের থেকে শুনেছি, তাই ভাবলাম আপনাকে জিজ্ঞেস করি। আপনি গুরুজন বলে কথা।

নায়েকবাবু: আমি নেশা করিনি কখনো। তবে আমাদের কলেজে কয়েকটা ছেলে ছিল যারা এসব করতো। আমি সব সময়ই ওদের থেকে দূরে থাকতাম।

আমি: কিন্তু আপনার কখনো মনে হয়নি যে একবার একটু ট্রাই করে দেখি?

আমি চোখ টিপলাম।

নায়েকবাবু: না। তুমি আগে বলো তুমি এগুলো করো না তো?

আমি কিছু না বলে পকেট থেকে একটা কৌটো মতো(ক্যাপাসিটর) বার করলাম।

আমি: আমি আপনাকে একটা জিনিস দেখাই।

বলে আমি আমার হাতে লাল ক্যাপাসিটরটা ডলতে থাকলাম। ডলতে ডলতে বললাম আমার ইচ্ছে আছে জীবনে এমন একটা জিনিস বানাবো যেটা শুকলে মানুষ যা চাইবে তাই পেয়ে যাবে। মানে সত্যিকারের সেটা না ঘটলেও চোখের সামনে সেটাই দেখবে।

কাকু অবাক হয়ে বললেন, : আমি ঠিক বুঝলাম না । কিন্তু তোমার হাতে এটা কি বলোতো?

 

আমি বললাম : কাকু ,এটা একটা ক্যাপাসিটর। ইলেক্ট্রিক সার্কিটএ থাকে। এই দেখুন, উপরে একটা কৌটো মতো আর নীচে দুটো তার। আপনি এটাকে চার্জ দিয়ে এটার মধ্যে অনেক শক্তি জমিয়ে রাখতে পারবেন । আর যখন আপনার শক্তি দরকার এর থেকে শক্তি নিতে পারবেন। আপনার আমার সবার জীবনে ক্যাপাসিটর একটা খুব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস।

 

বলে আমি আমার নাকের কাছে ধরলাম ক্যাপাসিটরটা।

কাকু বললেন : তো তুমি এটা নিয়ে ঘুরছ কেন?

আমি: কাকু আমি ছোট থেকেই সায়েন্স, ইলেক্ট্রিসিটি, সার্কিট এসব নিয়ে এত পাগল যে যেখানে যাই কিছু না কিছু নিয়ে যাই। আর আমার নতুন যন্ত্রের গন্ধ শুকতে ভালো লাগে। আমি অদ্ভুত একটা আনন্দ পাই। না শুকলে মনই ভরে না।

বলে আমি খুব জোরে স্নর্ট করলাম কৌটোটার ভেতরের কিছু একটা।

নায়েকবাবু: তুমি তো খুব ডেডিকেটেড ছেলে দেখছি। জানো, ছোটবেলায় আমার ইচ্ছে ছিল বিজ্ঞান নিয়ে পড়বো, গবেষণা করবো, কিন্তু একসময় টাকা পয়সার অভাবে তা আর হয়ে উঠলো না।

আমি: আমি বুঝি কাকু আপনার কষ্টটা। দুঃখ পাবেন না। আপনিও একটু শুঁকে দেখুন, খুব মিষ্টি সুন্দর গন্ধটা।

নায়েকবাবু: বলছো? খারাপ কিছু নেই তো এতে?

আমি: কাকুঊঊ, কি খারাপ থাকবে বলুন? নিয়ে দেখুন একবার। তারপর বলবেন।

কাকু ক্যাপাসিটর টা হাতে নিলেন, ভালো করে দেখলেন। তারপর বললেন কিন্তু এর ওপরে একটা ছোট ফুটো রয়েছে কেন ?

আমি : ফুটো কাকু আমাদের জীবনে দেহে সর্বত্র ছড়িয়ে আছে । ওটা নিয়ে অবাক হবেন না ।

এবার কাকু হালকা শুঁকে বললেন, :এই, এর ভেতরে পাওডারের মতো কি যেন রয়েছে। আর তুমি যেরম বলছিলে ওরম গন্ধ তো কিছু পেলাম না। তবে মাথাটা কেমন একটা ধরে উঠলো হঠাত করে ।

আমি বললাম,: ওটা একটু হয়। চাপ নেবেন না। আমারও হয়। গুছিয়ে কথা বলতে সাহায্য করে এটা আমায়। আপনার হয়তো হালকা সর্দি আছে তাই গন্ধটা বুঝতে পারেননি আপনি । একটু জোরে আর একবার টেনে দেখুন পান কিনা কিছু গন্ধ ।

কাকু আর একবার টেনে আমায় ফেরত দিলেন ক্যাপাসিটর টা। তারপর একটু ঢুলু ঢুলু চোখে বললেন: বাইরে কি খুব বৃষ্টি পড়ছে, ঝড় হচ্ছে?

আমি বললাম: কৈ নাতো।

কাকু বললেন,: কয়েকদিন আগেই আমাদের বাড়িতে বাজ পড়ে টিভি, ওয়াশিং মেশিন সব খারাপ হয়ে গেছে। তাই আমি টিভির তারটা খুলে দিয়ে আসি।

বলেই তিনি উঠে যাচ্ছিলেন।

আমি গিয়ে ওনাকে আটকালাম।

আমি: কাকু, ঝড় আসেনি। আপনি বিশ্বাস করুন। ঝর আসলে আমি নিজে গিয়ে টিভির তার খুলে আসবো।

নায়েকবাবু: ও তাই? কিন্তু আগের টিভিটা খুব বাজে ভাবে ভেঙে গেছিল।

আমি: তাই? কাকু, আমি এরকম অপঘাতে মৃত্যু হওয়া যন্ত্র কালেক্ট করেই থাকি। আপনি যদি কিছু না মনে করেন আমি কি আপনার পুরোনো ভাঙা টিভিটা নিতে পারি?

কাকু আমার দিকে কেমন একটা হাঁ করে তাকিয়ে ছিলেন। একটু পর হাসলেন। দিয়ে বললেন: টিভির ভেতরে  অনেক ক্যাপাসিটর আছে বলে? হা হা হা ! এটাই তোমার জরুরি কথা তাইনা? হা হা হা.. আচ্ছা টিভিতে যে লোকটা রোজ খবর পড়ে সে কি টিভির ভেতরেই থাকে ?

আমি মনে মনে বললাম আপনি খুব ভালো করেছেন বিজ্ঞানী হননি।

উনি হাসতে থাকলেন। আমি বললাম : কাকু একটা মজার কথা মাথায় এলো, বলব?

কাকু বললেন : বলো।

আমি বললাম আচ্ছা ধরুন এরম একটা দুনিয়া আছে, যেখানে সব মানুষ সব সময় নেশাগ্রস্থ থাকে। তাদের আলাদা করে নেশা করতে হয়না । তারা এমনিতেই সব সময় চুর হয়ে থাকে নেশায়। এটাই ওদের জন্য সাভাবিক। ওদের দুনিয়ায় এক ধরনের পাতা পাওয়া যায় যেটা শরীরে নিলে নেশাগ্রস্থ থেকে সাভাবিক অবস্থায় আসা যায়। বুঝলেন ?

কাকু মাথা নাড়লেন।

আমি : আপনি ধরুন সেরম একটা দুনিয়ায় পৌছে গেছেন। আর সেখানে নেশা কাটিয়ে সাধারণ হওয়া টা আইন বিরুদ্ধ। তখন আপনি কি করবেন? আপনি কি আইনের বিরুদ্ধে গিয়ে সেই পাতার খোজ করে সেটা খেয়ে সাধারণ হবেন, নাকি বেআইনি কাজ না করে আপনি নেশাতেই থাকবেন ?

কাকু বললেন, অত সত জানিনা বাবু, আমি টাকেশ্বরীর এক হাঁড়ি কেওরাজল দেওয়া বিরিয়ানি খাবো।

আমি হেসে ফেলে জিজ্ঞেস করলাম টাকেশ্বরী আবার কোন দোকান? ঢাকেশ্বরী শুনেছি, কিন্তু টাকেশ্বরী তো শুনিনি।

কাকু বললেন, আরে ওই দোকানটা চেননা? যেখানে খাবার টেবিল নেই কোনো, শুধু চেয়ার আছে। টেবিলের বদলে টাকওয়ালা লোকেরা উবু হয়ে চেয়ারের সামনে বসে থাকে, আর তাদের টাকের ওপর থালা রেখে কাস্টমাররা খায়। এই য়ামবিএন্স টাই ওদের স্পেশালিটি।

আমি মনে মনে ভাবলাম বয়স হলে, যদি টাক পরে যায় এই রেস্তোরাঁর ওয়েটার হওয়া যাবে।

কাকু মনে হয় মনে মনে টাকেশ্বরীতেই পৌঁছে গেছিলেন, হঠাত ওনার ফোন বেজে উঠলো।

কাকু বললেন, : আমার মেয়ে ফোন করেছে কোলকাতা থেকে, একটু কথা বলেনি।

আমি: হ্যাঁ হ্যাঁ নিশ্চই।

নায়েকবাবু (ফোনে): হ্যাঁ মা বল, কেমন আছিস? … … … খাওয়া দাওয়া করছিস তো ঠিক করে?… … … আমাদের এখানে তো খুব ঝড় বৃষ্টি হচ্ছে, তর ওখানে বৃষ্টি পরছে নাকি?… … …আজকে জানিসতো একটা ছেলে এসেছে আমাদের বাড়িতে ক্যাপাসিটর বিক্রি করতে। তো সে কয়েকটা ক্যাপাসিটরএর গন্ধ শোকালো ; ভারী মিষ্টি গন্ধটা। … … … … … … … আচ্ছা আচ্ছা, ভালো থেকো রাখলাম ,হ্যাঁ ?

আমি মনে মনে ভাবলাম, কি ! আমি ক্যাপাসিটর বিক্রি করতে এসেছি?

ভেতর থেকে আবার শুনতে পেলাম,: তুমি চানে আজকে যাবে? না যাবেনা?

কাকু যেন কিছুই শুনতে পেলেন না। আমি বললাম,: কাকু কলকাতার নামকরা দোকান, প্রস্তাবের জল ভরা মিষ্টি।

আমি একটা মিষ্টি বাক্স থেকে বের করে কাকুর মুখের কাছে ধরলাম। কাকু সুবোধ বালকের মতো খেয়ে নিলেন।

হঠাৎ কাকিমা ঘরে ঢুকে এলেন। বললেন: তুমি কি বলতে চাও বলোতো।

আমি কয়েকবার ঢোগ গিলে বললাম,: আমি আসলে আপনার মেয়েকে ভালোবাসি। আমি তাই বিয়ের প্রস্তাব এনেছিলাম।

কাকু মিষ্টি খেতে খেতে মুচকি হাসলেন, গলে গেলেন। তারপর হাত তুলে বুড়ো-আঙ্গুল দেখিয়ে “অসাম” আর “জিও” বলে  সম্মতি জানালেন। বললেন শুধু তারিখটা জানিও। বাকিটা আমাদের ।

এসব দেখে কাকিমার তো চোখ কপালে উঠলো।

কাকু বললেন, আর কয়েকটা ক্যাপাসিটর হবে?

আমি ভাবলাম, সত্যিই কি খুব অদ্ভুত প্রস্তাব?

cap - Copy