বিষাক্ত মানুষ

আমি বোবা। বলতে পারিনা, শুধু বুঝতে পারি। আর ভাবতে ভালোবাসি। বালিগঞ্জের বস্তিতে বসবাস। ঠেকনা দেওয়া ঘরে ফ্যান জোটেনি। তাই গরমে ঘেমে প্রতি রাতে মাকর্শার জাল গুনি, আর এক দৃষ্টিতে দেখি কিভাবে ছোট ছোট পোকা গুলো একের পর এক জড়িয়ে যায় জালে। তাদের নির্বাক ছটফটানি।

সেভাবেই আমাকেও রোজ যেতে হয় বস্তির একটা সোশ্যাল রিফর্ম স্কুলে। ইচ্ছা নেই পড়াশোনা করার। তাও যাই। কারণ আমরা গেলে ওদের ভালো লাগে। ওরা মনে করে আমাদের বা সমাজের বিশাল উপকার করছে। মনে করে এভাবে সমাজ বদলে দেবে। কিন্তু আমি জানি। ঘন্টা বদলাবে!

আমাদের ক্লাস নেয় একটা দিদি। দিদিটা মনে হয় ভালো। কিন্তু আমরা বস্তির মানুষ, আমরা শিখিনি ভালো খারাপ বুঝতে। আমাদের বুদ্ধি কম। তাই আমাদের কাছে দিদিও আর পাঁচটা বাইরের মানুষের মতোই। বস্তির বাইরের পৃথিবীটা আমাদের ঘেন্না করে। দিদি মনে হয় করেনা। দিদির মধ‍্যে একটা অন‍্যরকম ব‍্যাপার আছে। বাইরে থেকে একটু শান্তশিষ্ট স্বভাবের মনে হলেও কখনো কখনো একটা অন‍্য মানুষ উঁকি দেয় ভেতর থেকে। চোখটা টানা আর কটা। চুল বাঁধা হলেও চুলের আগায় ঢেউ খেলনো কারসাজি। ঠোঁটটা ছোট, সুন্দর, কিন্তু লিপিস্টিকের পেছনে তামাক টেনে খয়েরি হয়ে যাওয়া চামরা আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি। কখনো কখনো মনে হয় দিদি আমাদের-ই একজন। শুধু বাইরে একটা মুখোশের জাল লাগানো আছে। কিন্ত আমি কখনো সেই জালটা সরিয়ে দেওয়ার সাহস পাইনি। পাছে জালে জড়িয়ে যাই!

আমি তো বলতে পারিনা। তাই শুধু তাকিয়ে থাকি দিদির দিকে। আমরা বস্তিতে মারপিট আর পেঁয়াজি করেই বড় হয়েছি। ভালোমানুষি খুব একটা ধরা দেয়না আমাদের চোখে। লোকে বলে আমরা শুধু দেখি চামড়া।

সেদিন মেঘলা কলকাতা। ক্লাসে যাইনি কারণ বস্তির ছেলেদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম বাজারের ধারে। আড্ডায় আমার ভূমিকা হল শুধু শুনে যাওয়া আর মাথা নাড়া। তিন নম্বর বিরিটা শেষ হতেই আমাদের নেতা হুলো বলল “চ একটু কচুরি খেয়ে আসি”। পয়সা তো ছিলনা পকেটে। কিন্তু খেতে পয়সা লাগেনা, লাগে ক্ষিধে।

আমরা সোজা গিয়ে বসে পড়লাম কানুদার মিষ্টির দোকানে। কানুদা আমাদের দেখে একবার চোখ কোঁচকালো। জিজ্ঞেস করল “কিরে হুলো পয়সা আছে তো?”। হুলো তো প্রশ্ন করার আগেই উত্তর ঠিক করে বসে ছিল। বলল “এভাবে বলছো কানুদা? আমরা পাড়ার ছেলে হয়ে আমরা তোমার টাকা মারবো?” কানুদা একটু ভরসা পেয়ে বললো “ঠিক আছে তোরা প্লেট নিয়ে বস আমি কচুরি দিচ্ছি।”

শুরু হল জোর কদম খাওয়া। আমি বরাবরই একটু সময় নিয়ে খাই। সেটা জেনেও হুলো আমার পাতে কানুদাকে বলে বেশি বেশি করে কচুরি দিয়ে দিলো। আমি তো একদম মগ্ন হয়ে খেয়ে চলেছি। হঠাৎ খেয়াল করলাম আমার দলের বাকিরা কেউ নেই দোকানে। আমি কানুদাকে অঙ্গভঙ্গি করে জিজ্ঞেস করলাম বাকিরা কোথায়। কানুদা বললো ”ওরা তো চলে গেছে তোর সময় লাগছে দেখে। আর বলে গেল তোকে নাকি খাবার টাকা দিয়ে গেছে।” আমি তো শুনে অবাক! আমার পকেট ফাঁকা! আমি একবার কানুদাকে বোঝানোর চেষ্টা করবো ভাবলাম যে আমার কাছে টাকা নেই। কিন্তু পরমুহূর্তেই মনে হলো হুলোরা এত বড় বড় কেস খেতে খেতে পালিয়ে গেল আর আমি এই সামান্য কচুরি চুরি করে পালাতে পারবোনা? লাগালাম কচুরি ফেলে ছুট!

কানুদা আমি দৌড়াচ্ছি দেখে হৈ হৈ করে “ধর শালা কে ” বলে ছুটলো পেছনে। চুরি করে ছোটার সময় একটা নিয়ম হল বারবার পেছনে তাকাতে নেই। তাতে ছোটার ফোকাস হারিয়ে যায়। উর্ধঃশ্বাসে শুধু ছুটে যেতে হয়। আমি ঠিক সেই ভুলটাই করলাম। পেছনে ফিরে দেখছিলাম কানুদা কতটা দূরে। ল্যাপ-এ বিট দিয়ে দিলে আবার মুশকিল হয়ে যাবে!

দেখলাম বেশ অনেকটা পেছনে পড়ে গেছে নাদুস নুদুস কানুদা। স্বস্তির নিঃশাসটা নেওয়ার আগেই পায়ের তলা থেকে মাটিটা সরে গেল। মাথাটা জোরে গিয়ে লাগলো একটা কংক্রিটে। পড়লাম আমি হাই ড্রেনে। পেছনে তাকানোর ফল।

সাঁতার কাটতে জানি। কিন্তু মাথায় খুব ব্যথা করছিল। পাটা নাড়াতে গিয়ে বুঝলাম পায়েও লেগেছে। তার ওপর ড্রেন তো আর কলেজ স্কয়ের এর সুইমিং পুল নয় যে সাঁতার কেটে বেরিয়ে যাবো। চারদিকে ভর্তি পাঁক। আমি বুঝলাম আমি আস্তে আস্তে ডুবে যাচ্ছি। বাঁচার চেষ্টা করে খুব একটা লাভ হবে না। দেহটা হালকা করে দিলাম। মাথার কাছটায় বালিশের মতো লাগছিল। আরাম করে পেতে দিলাম বালিশে মাথা। হঠাৎ সেই বালিশটা আমার চুলের মুঠি ধরে নাড়া দিল। বুঝলামনা কিছু। বালিশটা আমার চুলটা টেনে পাঁক থেকে আমায় উপরে তুলল। আমি ভয়ে থরথর করে কাঁপছি। হুলো আমায় ড্রেনের পাশে শুয়ে দিয়ে বলল ” দেখে দৌড়াতে পারোনা গান্ডু?” আমি উঠে জড়িয়ে ধরলাম হুলোকে।

ততক্ষনে রাস্তায় লোক জড়ো হয়ে গেছিলো। ভিড়ের মধ্যে থেকে হঠাৎ দেখি ক্লাসের দিদি এগিয়ে এসে জিজ্ঞেস করলো কোথায় লেগেছে। দিদি ডাক্তারি পড়েছে। আমি হাত দিয়ে দেখলাম মাথায় কাঁধে আর পায়ে। আমার ঠোঁট দিয়েও রক্ত ঝরছিল। দিদি সঙ্গে সঙ্গে এ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করে দিল। হসপিটালে অনেক কটা স্টিচ পড়ল। দিদি বললো হসপিটালে না থেকে দিদির বাড়িতেই রাত্রে থেকে যেতে। গেলাম সেখানেই।

বড় বাড়ি। একাই থাকে দিদি। এত বড় বাড়িতে প্রথমবার ঢুকে একটু অদ্ভুত লাগছিল। দিদির ঘরে অনেক বই এদিক ওদিক ছড়ানো। পাশে একটা ডায়েরিও চোখে পড়ল। তার ওপর জালের মতো একটা নক্সা করা। অনেকদিন পড়ে থেকে ধুলো পড়ে গেছে ডায়েরিতে । আমি সেই ধুলোর ওপর আঙুল দিয়ে কি একটা আঁকার চেষ্টা করছিলাম। কিন্তু সেটা হিজিবিজিতে গিয়ে ঠেকল। যেন একটা অনেক লম্বা সাপ নিজেই নিজের প্যাঁচ এ জড়িয়ে গেছে!

আমায় খেতে দিয়ে দিদিও বসলো খাবার নিয়ে। আমি বলতে পারিনা। তাই দিদিই বলছিল। আমি শুনছিলাম দিদির একাকিত্বের গল্প। সেই ভেতরের অন্য মানুষটা যেন বেরিয়ে আসছিল বারবার। মনে হচ্ছিল পাশের বাড়ির বিধবা মাসির গল্পই যেন শুনছি। কখনো কখনো এক ভাবে তাকাচ্ছিলাম দিদির দিকে। সেই চাহনির বিষ!

খেয়ে উঠে আয়নায় দেখলাম ঠোঁটে কালশিটে পরে নীল হয়ে গেছে। ব্যাথাও আছে ভালোই। দিদি আমায় নিয়ে গিয়ে শুয়িয়ে দিলো বিছানায়। আমি চোখ বুজে শুয়ে ছিলাম। ঘুম নেই।

একটু পরে দিদিও এসে আমার পাশেই শুলো। ঘরে আলো নেই। শুধু পর্দার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে ল্যাম্প পোস্টের আলো এসে পড়ছিল আমার কাঁধের সেলাইটার ওপর। একটা রাতের পাখি ডাকছিল বারবার। আমি কান খাঁড়া করে শুনছিলাম তার ডাক। হঠাৎ অনুভব করলাম আমার কাঁধের কাঁচা সেলাই এর ওপর দিদির হাত। ব্যথা হল একটু। কিন্তু স্থির রইলাম। দিদির হাতের ছেঁকায় কাঁপুনি আসছিল। আমি এবার চেপে ধরলাম হাতটা। ফিকে আলোয় দেখতে পেলাম একটা দেহের তোবড়ানো ছায়া। ছায়াটা হঠাৎ মিলিয়ে গেল অন্ধকারে আর চেপে বসলো আমার ওপর। মনে হল একটা ধোঁয়ার দেহ খুব কাছে থেকে দেখেছে আমায়। নেকড়ে বাঘ যেমন তার শিকারকে গভীর ভাবে দেখতে থাকে। মাঝে মধ্যে আমার ক্ষতগুলো ব্যথা করে উঠছিল সেই ধোঁয়ার ছোঁয়ায়। কিন্তু সেই ব্যথার মধ্যে মেশানো ছিল বিষের সুখ! অনবদ্য !

একটু পরেই আমার মুখের ওপর এক গোছা চুল এসে পড়ল। আমি এবার চেপে ধরলাম সেই চুলের মুটি। কাঁধের সেলাই এ টান পড়ল। কিন্তু আমরা বস্তির ছেলে । আমাদের ব্যথা লাগেনা। তাই কোনো আওয়াজ করলাম না। নীলচে আলোর আভায় দেখতে পেলাম একজোড়া তীক্ষ্ণ চোখ। কালচে ছটফটে দেহটাকে এবার চেপে ধরলাম আমার কাছে। আমার কাঁধের থেকে গড়িয়ে পড়া রক্ত লাগলো তার চামড়ায়। অনুভব করলাম …

bm il2 - Copy (3)

ফ্যাকাশে আলোর মায়াবী ঘরে নেই মাকর্শার জাল। তবু জালে বন্দি আমি! আমার নীল ঠোঁট আরো বন্য হয়ে ছুঁল তার কপাল। নাক। ঠোঁটের কাছাকাছি আসতেই সাপের ছোবলের মত কামড়ে ধরলাম তাকে। একটু ছটফটানি অনুভব করলাম তার মধ্যে। কিন্তু আমি ছাড়লাম না। বিষাক্ত দংশনে যেন থিতিয়ে গেল সময়। এরপর নিঃশব্দে ওষ্ঠমিলন। 

ঘুলঘুলি থেকে একটু আলো ঢুকে নক্সা বানিয়েছিল দেওয়ালের গায়ে। নক্সাটা হঠাৎ ঢেকে গেল আমার চোখের ওপর পড়া চুলে। আমার জ্ঞান হারালো। তারপর সব কালো। আর কিছু মনে নেই।

এরপর যখন চোখ খুললাম দেখি আমি আমার বস্তির ঘরে শুয়ে। চেনা মাকড়শাটা আমার দিকে তাকিয়ে। আমার মনে আছে আমি সেদিন প্রথমবার চিৎকার করেছিলাম। জানিনা কারুর কানে পৌঁছেছিল কিনা সেই আওয়াজ। কিন্তু সেই নীল ঠোঁটের প্রথম চিৎকারে মিশে ছিল বিষের আত্মকথা।

আরো এক সপ্তাহ কেটে গেছে। আমি তখনও পুরোপুরি ভাবে সেরে উঠিনি। ইতিমধ্যে সোশ্যাল রেফর্মের স্কুলও বন্ধ হয়ে গেছিলো। তাই দিদির দেখা পাইনি আর।

একটা ধুলোর দিনে খোঁড়াতে খোঁড়াতে চেষ্টা করেছিলাম দিদির বাড়িটা খুঁজে বের করার। কিন্তু পেলাম না খুঁজে। শুধু বৃষ্টিই এল। রোদ আর উঠলোনা।

মাঝখানে একটা চিঠি পেয়েছিলাম দিদির কাছ থেকে। তাতে লেখা ছিল যে দিদি আমার ভালো চায়। আর ওই রাতের কথাটা যেন গোপন রাখি। দিদির ভাষায় কোথাও যেন একটা দুর্বলতার ছোঁয়া লেগেছিল। পুরোটা পড়ার পর কি মনে হয়েছিল ঠিক ভাবে মনে নেই। তবে সেদিন দিদির চিঠিটা আমার প্রিয় ঘুঁড়িটায় চিটিয়ে উড়িয়েছিলাম। খুব টান দিয়েছিল ঘুঁড়িটা।

সেদিন হয়তো বোঝার চেষ্টা করেছিলাম দিদির মনটা।ভেবেছিলাম দিদির চিঠির উত্তর দেব। লিখতেও বসেছিলাম। কিন্তু কয়েক লাইন লেখার পর বুঝলাম আমার দ্বারা এসব হবেনা। আমরা বস্তির বাসিন্দা। লোকে বলে আমাদের রক্তে অনুভূতি কম। তাই আজও সেই মুচড়ে ফেলা চিঠিটা ঘরের নর্দমায় জল জমায়।

একদিন হঠাৎ হুলো মাঝ রাতে এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে বলল “ভাই শুনলাম ওই পাঁচুদার ঠেকের পাশের ঘরটা নাকি একটা নতুন বোবা মাল ভাড়া নিয়েছে। চল দেখে আসি একবার মালটা কে”। আমি বেরিয়ে পড়লাম হুলোর সাথে।

ঘরের সামনে গিয়ে দেখি দরজা খোলা। ভেতরে একটা মোমবাতি জ্বলছে। ভেতরে ঢুকলাম। ঘরে নেই কেউ। শুধু টেবিলের ওপরে একটা ডায়েরি রাখা। চিনতে পারলাম এটা দিদির ডায়েরি। কিন্তু দিদিতো বোবা ছিলনা। দিব্বি কথা বলতো! এরা তাহলে বোবা কেন বললো? হুলোকে বোঝালাম। হুলো তো প্রথমে বিশসাস ই করছিলনা। তারপর একটু ভেবে বললো “কে জানে বোবা হওয়ার নাটক করছে কিনা। লোকজনের হুজুগের তো অভাব নেই!”

আমার মনে পড়ে গেল সেই রাত্রের কথা। মনে পড়ল দিদির মুখটা। সেই ঝাপসা আলোয় দেখা ঠোঁট। মহাভারত পড়িনি, কিন্তু গান্ধারীর কথা শুনেছিলাম।

দিদির ডায়েরীর শেষ পাতাটা খুলে পড়লাম : “আমি ভালোবাসি যাকে। সে বিষাক্ত মানুষ। … নীলাভ তার ঠোঁটে, সাপের ছোবল!

নীল রঙ হল ভীষণ প্রিয়

 

ট্রেন তখন ঝড়ের বেগে ছুটে ছলেছে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলের মায়াবী শূন্যতা ভেদ করে। আমার মন ছুটেছে তার পিছু পিছু। মুম্বাই-গামী দুরন্ত একস্প্রেস। চারপাশে গ্রামিন সৌন্দর্য‍্যের বাহার। তখন প্রায় বিকেলের রোদ পড়ে এসেছে। আকাশে খেলা করছিল টুকরো টুকরো মেঘ। দূরে নাম না জানা গাছ গুলোর দীর্ঘ নিঃসঙ্গতা ভেঙ্গে ছুটে চলেছি। আকাশে ফিকে হয়ে আসা রোদ্দুরের লুকোচুরি খেলা। হাল্কা আমেজের এলোমেলো অন‍্যমনষ্কতায় ভরে উঠছিল সময়। হঠাৎ ছোখ পড়ল দূরের আকাশের দিকে। দেখলাম কিছু নবাগত মেঘের সারি আকাশের একটা কোণের আংশ জবর-দখল করে বসে আছে। কিছুক্ষণের মধ‍্যেই তাদের আধিপত‍্য ছড়িয়ে পড়ল  সারা আকাশে। মনে হচ্ছিল কোন বিরাট শিশু যেন আকাশে ধুষর মাটি নিয়ে খেলা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছে। অনুভব করলাম চারিদিক একটা গভীর স্তব্ধতায় ছেয়ে গাছে। মন ভরেছে রোমাঞ্চে। প্রতিটি বৃক্ষ‍ যেন প্রকৃতির মহারাজার পদার্পণের ভয়ে তটস্থ। সেই অনুভূতি যেন শব্দে ব্যাক্ত করার অতীত। সাহিত্যের সীমারেখা শেষ হয়ে গাছে। এ যেন শুধু অনুভূতি আর অনুভূতি!

খামখেয়ালী-পনায় সাধারণ মানুষকে চিরকাল-ই আমি টেক্কা দিয়ে এসেছি। তাই সাভাবিক ভাবেই আমার ভেতরের খামখেয়ালী সত্ত্বাটা এই অদ্ভুত সৌন্দর্য‍্যের মায়ায়  আবার জেগে উঠেছিল। দিগন্ত বিস্তৃত ছোট ঘাস, মাঝে মাঝে বুকে ব্যাথা নিয়ে অপেক্ষা করা  বাবলা গাছ, মিশমিশে ঘন মেঘ আর গভীর স্তব্ধতায় ভরা বাতাস। নাহ! আর আটকানো যাচ্ছেনা নিজেকে। এই পরিবেশের কাছে আত্মসমর্পন না করার ধৃষ্টতা আমার পাগল মনের নেই! যে করেই  হোক ট্রেন থেকে নেমে এইখানে কিছুক্ষণ কাটাতেই হবে।

নোএতিক্স নামক প্যারাসায়েন্স-এর একটি শাখা আছে। তার মূল বক্তব‍্য হল যদি কেউ খুব মনে প্রাণে কোন ঘটনা ঘটার জন্য কামনা করে, তাহলে সেটা ঘটার সম্ভবনা বেড়ে যায়। আমার খেত্রেও কতকটা তাই-ই হল। কাছেই একটা ষ্টেশন এসে পড়ল এবং ট্রেনটাও যেন আমার জন‍্যই কোন অজ্ঞাত কারণে দাঁড়িয়ে পড়ল ষ্টেশনে। আর আমায় রাখে কে! পিঠের আর হাতের ব‍্যাগ নিয়ে তড়িঘড়ি করে নেমে পড়লাম।

ষ্টেশনের নাম বাস্তাবপুর। প্রত্যন্ত গ্রামের অনামি পরিত্যক্ত ষ্টেশন। প্ল‍্যাটফর্মটা বেশ নিছু আর ভাঙাচোরা।বহুকাল পূর্বের করা কংক্রিট গুলো এখন যেন ফোকলা দাদুর মতো ঈট-পাথর বার করা চেহারায় হাসছে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট ঘাসের ছোপ আর অনাদরে বেড়ে ওঠা বুনো ঝোপের সারি। এরাই বোধহয় এই নিভৃত ষ্টেশনের একমাত্র সঙ্গী। সব মিলিয়ে কেমন একটা অদ্ভূত সুন্দর পরিবেশ।

ট্রেনটা ষ্টেশন ছেড়ে বেড়িয়ে যাওয়ার সময়ে ট্রেনের যাত্রীরা অবাক হয়ে আমার দিকে তাকাচ্ছিল। আমিও মিষ্টি হেসে তাদের হাত নাড়লাম। ট্রেনটা ষ্টেশন থেকে বেড়িয়ে যেতেই ষ্টেশনের প্রকট শূন্যতাটা অনুভব করলাম। চত্বরটা প্রায় ফাঁকাই বলা যায়। বেশ কিছুটা দূরে ষ্টেশনের শ্রমিকদের  একটা আপরাহ্ন আড্ডা বসেছে। আশেপাশে কয়েকটা আনকোরা কুকুর খেলা করছিল। পিছনে বহু দূর পর্যন্ত দেখা যায় ছোট বড় গাছের শ্যামলা আভরন। চারধারটা দেখতে দেখতে একটা অন‍্যরকম দৃশ্য ছোখে পড়ল। ষ্টেশনের একপ্রান্তে নীল রঙের পোশাক পরে কেউ দাঁরিয়ে। দূর থেকে রংটা বেশ স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছিল। একটু এগিয়ে গিয়ে দেখতে পেলাম নীল রঙের শাড়ি পরে দাঁ‍‌ড়িয়ে একটি অল্প বৈশী মেয়ে। চেহারায় যেন একাকিত্ত মাখা। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ। হালকা হওয়ায় আঁচলএর শেষ ভাগটা এদিক ওদিক নড়েচড়ে খেলা করছিল। একটু অবাক হয়েই এগিয়ে গেলাম। আমি কাছাকাছি আসতেই তার দৃষ্টি আমার চোখে এসে  পড়ল। এইরকম দৃষ্টিপাতে অনভ‍্যস্ত হওয়ার দরুন আমি একটু অপ্রস্তুত হয়ে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তার চোখের কোণে যেন একটা সরল চাঞ্চল‍্য উঁকি মারছিল। তবুও মায়াময় সেই অনিমিখ চাহনি।

সেই এক পলকের চাহনিই যেন আমার মনটাকে পাগল করে দিল। অদ্ভুত এক মিষ্টি হাসির ইঙ্গিত ছিল তার ঠোঁটের কোণায়। কাঠের পুতুলের মত অসহায় আত্মসমর্পণ করলাম মুহূর্তটার কাছে। এইরকম আরো কিছু অপ্রস্তুত মুহূর্তের পর অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে একটু এগিয়ে গিয়ে বললাম : “নমস্কার। আমার নাম আকাশ। আপনি কি এই জায়গাটা চেনেন?”
মেয়েটি বলল : “নানা আমিও এখানে প্রথম আসছি। আর আমার নাম বৃষ্টি। তা আপনি কোথা থেকে আসছেন?”

তার কথা গুলো যেন একটাও বুঝতে পারলাম না! আমার তখন সমস্ত মনোযোগ তার চোখের গভীরতায় আত্মহারা। তার প্রশ্নের উত্তর দিতে ইচ্ছা হচ্ছিল খুব। কিন্তু কি যে বলব সেটা কিছুতেই ঠাওর করে উঠতে পারছিলাম না। খুবই একটা অস্বস্থিকর পরিবেশ তৈরি হয়ে গেছিল। কিন্তু শেষমেষ তা আর হলনা, কারণ হঠাৎ যেন আমার মনে হতে লাগল আমার কাঁধে হাত দিয়ে কেউ আমায়  পিছন থেকে ডাকছে। পেছনে মাথাটা ঘোরালাম। আমার যেন বিশ্বাস হল না।

দেখলাম আমি ট্রেনের সাইড আপ্পার বার্থে শুয়ে আছি আর প‍্যান্ট্রিকারের কর্মি আমার সামনে তুলে ধরেছে বিকেলের চা-এর কাপ। 

হায় রে! এ কি তাহলে স্বপ্ন ছিল? চা-এর কাপটা নিয়ে উপরের বার্থ থেকে নীচে নেমে পড়লাম। চোখ পড়ল জানলার দিকে। কি আশ্চর্য! এ তো স্বপ্নে যা দেখেছি পুরো তাই! 

বিস্তৃত নিস্তব্ধ ঘাসভূমি, ধূষর মেঘে ছেয়ে যাওয়া আকাশ! আমার ঘুমের ঘোর তখনও কাটেনি। হাল্কা ঝাঁকুনি হাওয়ায় বুঝতে পারলাম ট্রেনটা ব্রেক কষেছে। আর কয়েকবার ঝাঁকুনির পর ট্রেনটা পুরোপুরি থেমে গেল। সহযাত্রীরা কেউ কেউ  বলল : “কেউ হয়তো চেন টেনেছে। “ 

আমি আর দেরি করলাম না। তাড়াতাড়ি নিজের ব‍্যাগপত্র নিয়ে নেমে পড়লাম ট্রেন থেকে। একটু পরেই ট্রেনটা আমায় ফেলে বেরিয়ে গেল। লাইনের উপর মিলিয়ে যাওয়া ট্রেনটার আওয়াজ যেন অনেক্ষন কানে লেগেছিল। তাকালাম চারধারে। আকাশ জুড়ে মেঘের গম্ভির আবেশ আমার মন কে ছেয়ে ফেলেছিল। আবার যেন অনুভব করলাম সেই স্বপ্নে দেখা অদ্ভুত সৌন্দর্য‍্যের হাতছানি। সেই অনবদ‍্য অনুভূতির ঝিনুক কোড়াতে কোড়াতে ট্রেন লাইনের পাশ দিয়ে এগোতে থাকলাম। 

যেতে যেতে ভাবছিলাম স্বপটা কি শুধু স্বপ্নই ছিল? আমার মন কিন্তু বলছিল ওটা যেন শুধু স্বপ্ন নয়, ওটা ভবিষ্যতেরই পূর্বাভাস। কোথায় যেন পড়েছিলাম স্বপ্নেরা আমাদের চাপা পড়ে যাওয়া কামনা ও আতঙ্কের প্রতীকী রূপ। তারা ছন্নছাড়া, বাঁধনহীন। প্রায়শই তারা কিছু গোপন গভীর অনুভূতির উন্মেষ ঘটায়। স্বপ্নের স্মৃতিরা নরম ও আবছা। কিন্তু আমার মনের ভিতর নীল দাগটা তখনও স্পষ্ট আর গভীর। 

পাশের একটা ঝোপের কোনায় একটা কালো মাকড়সা নড়াচড়া করছিল। তার পিঠের ওপরে একটা ছোট্ট নীলচে নক্সা। নীল বিপদসংকেত? 

 
এইসব ভাবতে ভাবতে কেন জানিনা মনটা একটু  ভারাক্রান্ত হয়ে উঠেছিল। দূর দিগন্ত থেকে ফিরে আসা পাখির ডানার ক্লান্তি ঘনিয়ে উঠছিল মনের আনাচে-কানাচে। মনে মনে ভাবলাম, নাহ! একটা সাধারন স্বপ্নকে এতটা পাত্তা দেওয়া উচিত হচ্ছে না।  এইসব এলোমেলো চিন্তা মাথা টাকে একদম ভরিয়ে তুলেছিল। হঠাৎ কিসে যেন জোরে ধাক্কা খেলাম! মাথায় বেশ লাগল।অন্যমনষ্ক হয়ে হাঁঠতে হাঁঠতে আমি বুঝতেই পারিনি যে আমি একটা ষ্টেশনের এত কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। চোখ খুলে দেখলাম ধাক্কা খেয়েছি ষ্টশনের নাম লেখা একটা বড় সাইনবোর্ডে। 

সাইনবোর্ডে বড় বড় করে নীল অক্ষরে লেখা : স্বপ্নপুর! 

নীল রংটা যেন আমার ব্যাথাটাকে আরো গভীর করে তুলল। 

হঠাৎ ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল। 

বৃষ্টি নামল বুকে। 

বৃষ্টি নামল চোখে। 

কিন্তু বৃষ্টির আওয়াজের মধ‍্যেই যেন কেউ পিছন থেকে বলে উঠল : “আপনার লাগেনি তো?” 

যুবতী কন্ঠস্বর! 

আমার হাসিও পেল। 

অকারণ হাসি। 

কাতুকুতু হাসি। 

 পিছনে ফিরে জলে ভেজা ঝাপসা চোখে দেখলাম একটু দুরে একটা নীল ছায়া মুর্তি।  

আমার যেন বিশ্বাস হল না!

 

 

a - Copy - Copy

 

(চিত্র : চিত্রম )