লুই ও আশ্চর্য্য বেড়াল

সাল ১৮৮৪। কোনো এক দিন।

বেজায় বৃষ্টি। সঙ্গে ছাতাও নেই লুই এর। গা মুছবার জন্য রুমালটা বের করতে যাবে, অমনি শুনল “ম্যাও!” কি আপদ! এই বৃষ্টিতে ম্যাও করে কে?

লুই দেখল তার পকেটে রুমালটা আর নেই, আর সামনে একটা অপুষ্টিতে ভোগা, রোগা সাদা কালো বেড়াল গোঁফ ভিজিয়ে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে তার দিকে।

লুই বলল , ” কি মুশকিল! ছিল রুমাল, হয়ে গেল বেড়াল!”

ওমনি বেড়ালটা বলে উঠল, ” মুশকিল আবার কি? ছিল প্রজা, হয়ে গেল দিব্বি একটা মোটাসোটা রাজা। এ তো হামেশাই হচ্ছে। হ য ব র ল পড়নি?” একটু ভেবে লুই বলল  ” নামটা তো শোনা শোনা লাগছে, কিন্তু তুমি পড়েছ?”

বেড়াল বলল “হ, য, ব আর র পড়েছি, কিন্তু ল (law) টা পড়া হয়নি। সেটা পড়লে কি আর বেড়ালদের দুনিয়ায় এত অনাচার হতে দিতাম? আমি ল পড়লে পৃথিবীতে শুধু একটাই ল থাকত: ‘বেড়ালকে দুধ খাওয়াও’; এত দুধ খাওয়াও যাতে ওর শেষ দিন পর্যন্ত নাক টিপলে দুধ বেরোয়, যাতে ও দুধের মধ্যে সাঁতার কেটে বেড়াতে পারে, ইচ্ছামৃত্যু হিসেবে দুধেলসমাধি বেছে নিতে পারে..। ” বলতে বলতে বেড়ালের চোখে জল চলে এল। (বাস্তববাদী পাঠকেরা চোখের জল না ভেবে বৃষ্টির জলও ভাবতে পারেন)।

লুই বেড়ালটাকে থামিয়ে বলল “কিন্তু তুমি তো সত্যিকারের বেড়াল নও, আসলে তুমি রুমাল, তাহলে তোমায় কি বলে ডাকব?”

বেড়াল বলল “বেড়াল বলতে পারো, রুমাল বলতে পারো আবার চিটারও বলতে পারো।” লুই বলল “চিটার কেন?”

শুনে বেড়ালটা “তাও জানো না?” বলে চোখ বুজে গান ধরল “চিটার পিটার মগজ মিটার গেছো দাদার রঙিন  গিটার ..”

লুই বেড়ালটাকে থামিয়ে বলল “আচ্ছা তোমার নাম তাহলে পিটার। এখন তুমি গেছো দাদার গল্প ছেড়ে আমার সাথে চল। বাড়ি গিয়ে বাকি কথা হবে না হয়।”

hjbrl
সুকুমার রায়ের “হ য ব র ল”-এর বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – সত্যজিত রায়।

পিটারকে সঙ্গে করে ঘরে ফিরল লুই। এমিলি(গিন্নি) ভেজা লুইকে দেখে বলল “এতবার বলি ছাতাটা নিতে ভুলে যেওনা, একটা কথাও মনে রাখনা।” লুই এমিলির কথায় কান না দিয়ে উৎসাহ ভরে বলল “দেখ গো কাকে এনেছি আজকে। একটা কথা-বলা বেড়াল!” তারপর পিটারের দিকে তাকিয়ে বলল “তোমার যে এত প্রশ্ন, সব এমিলিকে করবে, কেমন?”

ভেজা বেড়ালটা শুধু করুন মুখ করে বলল “ম্যাও, ম্যাওও”। এমিলি পিটারকে দেখে বলল “ও মা, বেচারা ভিজে কাক হয়ে গেছে। ওকে একটু গরম দুধ দি।”

লুই ব্যস্ত হয়ে বলল “কিন্তু ও জানোতো সত্যি কথা বলে।” এমিলি পিটার কে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যেতে যেতে বলল “ওটা তোমার মনের ভুল। পরের মাসে তোমার আঁকা ছবিগুলো ভালো বিক্রি হলে তোমায় ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো।”

লুই মুখ কালো করে পিটারের ভেজা লোমগুলো দেখছিল আর ভাবছিল বেড়ালদের দুনিয়ায় সত্যিই কত দুর্ভিক্ষ, কত অনাচার।

সাল ১৮৮৬। এমিলি কর্কট রোগে আক্রান্ত। লুই এমিলির সেবায় মগ্ন।

বিকেলবেলা বিছানায় শুয়ে জানলার বাইরে একটা গাছের পাতার দিকে তাকিয়েছিল এমিলি। শীতের আবির্ভাবে গাছের পাতা গুলো ঝরে ঝরে পড়ছিল। পিটার এমিলির পাশে বসে মন দিয়ে নিজের লোম চাটছিল। লুই কাছে একটা টেবিলে পিটারের ছবি আকছিল।

লুই চিন্তিত কপালে খাট এর পাশে এসে এমিলিকে বলল “এভাবে বাইরের দিকে তাকিয়ে কি ভাবছো? এই দেখো আমি কি এঁকেছি।” বলে লুই তার আঁকা পিটারের ছবিটা দেখালো। এমিলি যেন শুনতেই পেলনা কথা গুলো। মাছের মতো চোখ করে নিষ্পলকে তাকিয়ে ছিল জানলার দিকে। লুই এবার বলল “এমিলি, জল খাবে?” এমিলি এবার পাশ ফিরে মাথা নেড়ে হ্যাঁ বলল। লুই একটা পুরোনো কাঁচের গ্লাসে জল এনে পাশের টেবিলের উপর রেখে বলল “এই নাও জল।” তারপর লুই উঠে গিয়ে আরো কিছু আঁকা এনে এমিলিকে দেখাতে থাকল “এই দেখ, এটা হল পিটারের গোফ ভিজিয়ে দুধ খাওয়া। এই ছবিটায় পিটার গামছা পরে চান করছে।…” বলতে বলতে লুই নিজেই হাসছিল। লুইকে হাসতে দেখে এমিলির ঠোটেও হাসি টিমটিম করল। লুই এমিলিকে ছবি গুলো দিয়ে বলল “তুমি দেখো, আমি তোমার জন্য আরো ছবি আকছি। আর জলটা খেয়ে নিও।” এমিলি আর্ত স্বরে বলল “খাচ্ছি একটু পরে।” লুই আবার আঁকতে লাগল।

bathing
বেড়ালের স্নান করার চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

হঠাৎ ঝনঝন করে কাঁচ ভাঙার আওয়াজ হল। টেবিলের উপর রাখা জলের গ্লাসটা মাটিতে ভেঙে চৌচির। চারধারে কাঁচের টুকরো আর ঘরের একদিকটা জলে থৈথৈ করছে। পিটার খাট থেকে টেবিলে লাফানোর সময় কিছুভাবে তার গায়ে লেগে গ্লাসটা মাটিতে পড়ে গেছিল। এটা দেখে লুইএর মাথাটা হঠাৎ খুব গরম হয়ে গেল। হাতের কাছে আরেকটা গ্লাস ছিল। সেটা তুলে লুই গায়ের জোরে ছুঁড়ে মারল পিটারের দিকে। পিটার নিমেষে ছুটে ঘরের বাইরে মিলিয়ে গেল। লুই চিৎকার করে বলল “শয়তান বেড়াল, আজকে তোর খাওয়া বন্ধ।”

এমিলি খুব দুঃখ পেল লুইএর আচরণে।

ঘর থেকে বেরোনোর পথে ভাঙা কাঁচের টুকরোয় পা পড়ে পা কেটে গেল লুইয়ের। কালো ঘরে থমথমে নিস্তব্ধ সন্ধ্যা নামল।

সাল ১৮৮৭। মৃত্যুপর্ব ১।

বছর শুরুর কিছুদিনের মধ্যেই মৃত্যু হয় এমিলির। লুইএর ছবিতে নতুন সত্ত্বার প্রভাব পাওয়া যায় আজকাল। তার ছবিতে একের পর এক বেড়াল ঘুরে বেড়ায়। বেড়ালরা ছবিতে জামা কাপড় পরে, রেস্তোরাঁ এ যায়, গিটার বাজায়, আবার কোনো বেড়াল এক গুচ্ছ গোলাপও সাজায়।এমিলির প্রাণ স্পন্দন বারবার ধরা দেয় রং পেন্সিলে গড়া পিটারের ছায়ায়।

roses
বেড়ালের গোলাপ সাজানোর চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

যেন এক পাগল প্রেমিকের প্রলাপের গোলাপ উৎসর্গ পরোলোকের প্রেমিকার প্রতি।

সাল ১৮৯৮। মৃত্যুপর্ব ২।

মৃত্যু ঘটে পিটারেরও। এমিলিকে লুই পিটারের প্রাণবনতায় আঁকড়ে ধরে রাখত। পিটারের মৃত্যুর পর সেই প্রানের রং মিশতে থাকল লুইএর আকায়।

sad
বেড়ালের পেন্সিল স্কেচ। শিল্পী – লুই ওয়েন।

প্রাণ সর্বদা রঙিন নয়। কালো কল্পনার রংয়েও রাত্রি ঘনাত নোটবুকে।

সাল ১৯২৩। মৃত্যুপর্ব ৩,৪ ও সিজোফ্রেনিয়া।

জলে ডুবে যেতে থাকা মানুষের প্রাণ ফিরে পাওয়ার উদ্যম এক সময় থিতিয়ে যায়। লুইও বিষাদে ডুবতে ডুবতে সমুদ্রতল ছুঁয়ে ফেলে যখন তার মা(১৯১০) ও বড় বোনের(১৯১৭) মৃত্যু হয়।

লুইএর মনের নানান আগাছায় এবার সন্দেহের ফুল ফোটে। সেই ফুলের বিজ্ঞান সম্মত নাম সিজোফ্রেনিয়া। সেই ফুলের হরেক রূপ!

একদিন সকাল সকাল বাড়িতে এক অদ্ভুত গম্ভীর আওয়াজ হতে আরম্ভ করে। বিকট আওয়াজে চারধারে কানে তালা লাগে। একটু পরেই পাড়া প্রতিবেশী ও ঘরের বাসিন্দারা অবাক হয়ে আবিষ্কার করে লুইএর কীর্তি। লুই তার ঘরের সমস্ত আসবাব, কাঠের আলমারি, খাট, সব এদিক ওদিক সরিয়ে একাকার করছে। কোনো অজ্ঞাত অদৃশ্য শত্রুর সন্ধানে। অদৃশ্য শুত্রু তবুও লুকিয়ে থাকে লুইএর মনের সন্দেহ-নীড়ে।

আরেকবার লুই বড় পর্দায় ছায়াছবি দেখতে যায় বোনেদের সাথে। ছবি শুরু হওয়ার কিছুক্ষনের মধ্যেই লুই “ইলেক্ট্রিসিটি, ইলেক্ট্রিসিটি” বলে মাথায় হাত দিয়ে চিৎকার করে ওঠে। তার মনে হতে থাকে পর্দা থেকে বিদ্যুৎ যেন ফেটে বেরিয়ে তাকে আঘাত করছে। সেদিন রাত্রে লুইএর সংগ্রহে যুক্ত হয় “দা ইলেকট্রিক ক্যাট” নামক চিত্র।

সন্দেহ ফুলের আরেক কলি ফুটে ওঠে যখন লুই তার বোনেদের দোষারোপ করা শুরু করে তার থেকে টাকা চুরি করার কারণে। সেই অজুহাতে লুইএর চরিত্রে হিংসাত্মক বিবর্তন দেখা দেয়। লুইএর মনে সেই বাড়ন্ত গাছ পরিপূর্ণতা লাভ করার আগেই তার বোনেরা লুইকে ভর্তি করে এক মানসিক হাসপাতালে।

an electric cat
বৈদ্যুতিক বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

লুইএর মানসিক সম্যতা তবুও আলেয়া হয়ে ঘুরে বেড়ায় ছায়াছবির বৈদ্যুতিক পর্দায়।

সাল ১৯২৫। বিমূর্ত অভিব্যক্তিবাদ।

মানসিক চিকিৎসালয়ে লুই এর দিন কাটে বেড়ালের ছবি এঁকে। কিন্তু তার চিত্র-শৈলীতে এক অদ্ভুত পরিবর্তন ঘটে। তার ছবিতে দিন দিন বেড়ালের চোখ আরো উজ্জ্বল, দীর্ঘ ও প্রস্ফুট হয়ে উঠতে থাকে। বেড়ালের আকৃতিতে বিমূর্তির পরশ লাগে। উজ্জ্বল রঙিন জটিল নকশা ঘিরে ফেলে বেড়ালের মাংস পেশি। এক রহস্যময় সাইকেডেলিক অভিব্যক্তির সঞ্চার ঘটে তার চিত্রকলায়।

17
বিমূর্ত বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

স্মৃতি, কল্পনা , প্রকৃতি আর প্রানের সংমিশ্রনে যেন সৃষ্টি হয় পাগলাগারদের মোনালিসা!

(এই ছবি গুলোর সৃষ্টিকাল বিতর্কিত)

উপসংহার

উপেরের লেখাটি বিংশ শতাব্দীর বিশিষ্ট চিত্রকার লুই ওয়েনের জীবনী অবলম্বনে কল্পিত। অল্প বয়সেই লুই সিজোফ্রেনিয়া (বিতর্কিত) নামক এক মানসিক রোগের শিকার হন। কিন্তু তার আঁকা অগুন্তি বেড়ালের চিত্র বিপুল জনপ্রিয়তা লাভ করে তৎকালীন ইংল্যান্ড ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে। সময়কালে একের পর এক দুর্ঘটনার আবৃতি ও আর্থিক দুরবস্থা লুইএর মানিসিক ভারসাম্যর অবনতি ঘটাতে থাকে। ফলস্বরূপ এক অদ্ভুত হিংসাত্মক মনোভাবের বিকাশ ঘটে তার চরিত্রে। তাইতাকে পাঠানো হয় এক মানসিক চিকিৎসালয়ে। সেখানেও লুই ছবি আকতে থাকে এবং লুইয়ের ছবিতে এক আধুনিক বিমূর্ত ধারা প্রকাশ পায়। লুই এর শেষ জীবন কাটে মানসিক হাসপাতালের গন্ডিতেই। লেখক এইচ. জি. ওয়েলসের লুই ওয়েনের সমন্ধে এক উক্তি : “He made the cat his own. He invented a cat style, a cat society, a whole cat world. British cats that do not look and live like Louis Wain cats are ashamed of themselves.”

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় অর্ধে জ্যাকসন পোলক ও প্রমুখ চিত্রশিল্পীর সৃষ্টিতে বিমূর্ত অভিব্যক্তির(abstract expressionism) ধারা সাড়া ফেলে চিত্র জগতে। কিন্ত বিংশ শতাব্দীর শুরুতে পাগলাগারদে বন্দী বেড়ালের বিমূর্ত অভিব্যক্তি সেই তুলনায় রয়ে যায় উপেক্ষিত।

psyche
সাইকেডেলিক বেড়ালের চিত্র। শিল্পী – লুই ওয়েন।

বেড়ালদের দুনিয়ায় সত্যিই কত অনাচার! 

তথ্যসূত্র

1. V. Adrian, “100 Years of Traditional British Painting”, London : David and Charles, 1989.

2. S. Denham, “The Man who Drew Cats.”, The Guardian (newspaper), Aug. 5, 1960.

3. A. McGennis, “Louis Wain: His Life, His Art and His Mental Illness.”, Irish Journal of Psychological Medicine, vol. 16, no. 1, 2014, pp. 27-28.

 

Advertisements

ভালবাসা – অন্ধকার

একটা অন্ধকার ঘর। ঘরটা খুব অন্ধকার।

একটা অন্ধকার মন। মনটায় পায়চারি কার?

একটা অন্ধকার শরীর। স্পন্দনে আলো নেই।

একটা অন্ধকার প্রেম। হৃদয় ভালো নেই।

একটা অন্ধকার বিস্বাস। বিশ্বাস এ ভূমিকম্প।

একটা অন্ধকার প্রাণ। নিঃশ্বাসে আতঙ্ক।

একটা অন্ধকার ভ্রমর। অলি গলি ফুলেদের খোঁজ।

একটা অন্ধকার শহর। কাকদের বৈঠক রোজ।

একটা অন্ধকার ঠোঁট। মাংসতে দিতে চায় ডুব।

একটা অন্ধকার বুক।  উত্তেজ ওঠা নামা খুব।

একটা অন্ধকার আলো। নিভে গেছে প্রেম মোমবাতি।

একটু অন্ধকার ভালো। সস্তা উষ্ণতার সম্মতি।

ভালবাসা – অভিমান

যুক্তি : এই রইলো তোমার খেলনা গুলো। কমলা প্রেম, লজ্জা প্রেম, পুতুল প্রেম, পলক প্রেম। কোনটা নিয়ে খেলবে আজ?

হৃদয় : আমি খেলবনা আজ। মন খারাপ। আমায় তুমি অভিমান প্রেম এনে দাওনি।

যুক্তি : অভিমান প্রেম? ও আমাদের ধরতে নেই। ওতে ডাইনির বিষ থাকে গো; ঘুমের মধ্যে ঝগড়া-ভুত এসে কামড়ে দেয়।

হৃদয় : না না নাআ.. আমার ওটাই চাই। যাওনা, কল্পনাতে ছিপ ফেলে ধরে দাওনা অভিমান প্রেম।

যুক্তি : দাঁড়াও, একটু গার্গল করেনি।

হৃদয় : সর্দিকাসি, কলম আর ভালোবাসার ত্রিভুজের ভেতর আমাদের রোজকার জীবনটা কখনো সুখের। এই খাঁচার মধ্যে হরেক রকম খেলনা নিয়ে বেঁচে আছি আমরা দুটো পাখি।

আকাশের গভীরতর গভীরে যতদুর দেখা যায় সবই মিথ্যে লাগে ;  খাঁচাটাই শুধু সত্যি ।

ভালোবাসা – চোখ

তোমার চোখ প্রশ্ন করে? যখন তাকাও তুমি আমার দিকে? কাজলের ফাঁকে ফাঁকে কুড়াতে থাকো প্রশ্নের উত্তর গুলো? সেই জবাব গুলো নিয়ে কল্পনার কোলাজ সাজাও তুমি চোখ জুড়ে?

তোমার চোখের অপলক রং গুলো নিয়ে খেলতে খেলতে মাঝে মাঝে আমি থমকে যাই কেন? চোখের ভেতরে প্যাস্টল দিয়ে রং করতে করতে আমি শিশুর মতো ঘুমিয়ে পড়ি কেন? এ কি ঘুম না সম্মোহন?

তোমার চোখের পলক গুলোতে কখনো জং ধরে? পলকা হয়ে যায়? ব্যাস্ত হয়ে মিস্ত্রি ডাকো? তারপিন তেল ঢেলে বাঁচায় তারা এসে নিয়তির বিধান থেকে?

বৃষ্টির পর তোমার চোখের উঠানে ঘন সবুজ শ্যাওলা গুলো খুব পিচ্ছিল তাইনা? সাবধানে না চললেই পিছলে পড়ে কোমর ভাঙা! আমি চলবনা, ওখানে শুয়ে ঘুমাতে দেবে তো আমায়?

তোমার চোখ কখনো পানকৌড়ি সেজে ঘুরে বেড়ায় অপরাহ্নের নিস্তব্ধ পুকুরে? মাছের খোঁজে ডুব দেয় কচুরিপানার গভীরে? মাছ খুঁজতে খুঁজতে নিঃশাস যখন ফুরিয়ে আসে তখন দেখতে পাও আমাকে? আমি কিভাবে মাছ হয়ে তোমার ঠোঁটে ধরা দি?

তোমার চোখের শিরা উপশিরা গুলো কখনো ঝগড়া করে নিজেদের মধ্যে? কে সামনের সারিতে জায়গা পাবে বলে? ঝগড়া মেটাতে ডাকোনা কেন আমায়? তাকাওনা কেন তখন আমার দিকে চেয়ে?

তোমার চোখে সূর্য গ্রহণ হয়? চোখের রশ্মি গুলো কখনো ঢেকে যায় না কলঙ্কের চাঁদের ছায়ায়? ঢেকে গেলে জিজ্ঞেস কোরো মুখ পোড়া চাঁদকে, কখ্য পথ থেকে সরে যেতে ঘুষ নেবে কিনা।

তোমার চোখে ফেনা হয়? ছোট ছোট বুদবুদ গুলোর মসৃন ত্বক তোমার মণি স্পর্শ করে চাঞ্চল্যকর শুন্যতার পথে শহীদ হয়? আমায় ভরে রাখবে সেরকম একটা বুদবুদের মধ্যে? রঙিন খাঁচায়?

গতিহারা নদীর বদ্বীপের মতো, গ্রীষ্মে তোমার চোখের মণিতে চরা পড়ে? বর্ষায় নদীর গভীরে লুকিয়ে থাকা লজ্জা পাওয়া নুড়ি গুলো বেড়িয়ে আসে জমাট বাঁধা কুৎসিততা হয়ে?

তোমার চোখ কি নেশা করে? হৃদয় রসের নেশা? মহুয়াএ আচ্ছন্ন হয়ে নাবালক চিলের মতো ওড়ার চেষ্টা করে মণিতে শিকল বেঁধে? তোমার নেশাগ্রস্থ চোখের বিষন্নতায় আমারও কেন নেশা হয়?

চোখই জানে চোখের আলোর আবহাওয়ার গতিবিধি। আমি তো শুধু দেখতে চাই সময়কে; তোমার চোখের ভেতর থেকে। দেখতে দেবে তো?

ফ্রুট ‘ণ নাট

হৃদয় যেন নিজের সাথেই দ্বন্দ্বে বন্ধ।

গতকাল রাতে ভাবছিলাম কিনবো কিনা। তারপর কিনেই নিলাম।ক্যাডবেরি ফ্রুট ‘ণ নাট। ঠান্ডায় সারারাত থাকায় এখন মন আর ক্যাডবেরি দুটোই শক্ত হয়ে গেছে। ওটাকে পকেটে গুঁজে বেড়িয়ে পড়লাম।

খটখটে দুপুর বেলা অটো এ উঠেছি। উফ কি গরম। তার ওপর উত্তেজনা। ঘেমে চান। জল কম খাই বলে গিন্নি তো চিৎকারে শঙ্খচিল ; তাও এত ঘাম আসে কোথ্যেকে কে জানে। সে যাই হোক, সময় মতো পৌঁছতে পারলে হয়। অটো গুলো আবার ন্যাকামো মেরে সামনে দুজন নিতে চায়না। তাই অগত্যা পরের অটো এ উঠতে হল। তার ওপর আবার অটো ভর্তি না হওয়া পর্যন্ত যাবেনা সে। অটোওয়ালা অটোর বাইরে কাঁধে একটা গামছা নিয়ে দাড়িয়েছিল। আমি বললাম ” ও ভাই, আর কতক্ষণ ? এবার চালাও, এই দুপুরে আর লোক আসবেনা। রাস্তায় যেতে যেতে লোকজন পেয়ে যাবে।” । অটোওয়ালাটা আমার কথায় পাত্তাই দিলনা। কমবয়সী ছেলে ; ঘাড়ে ওঁ লেখা ট্যাটু , চুলে চিতা বাঘের মতো রং করা , ক্যাটক্যাটে লাল রঙের ফুলের নক্সা করা জামার উপরের দুটো বোতাম একদম নতুন আছে, কারণ জীবনে কোনদিন ওটা ব্যবহার হয়নি, সবসময় খোলা , অটোর পেছনে আবার কি একটা “দেখবি আর লুচির মতো ফুলবি “-গোছের লিখে রেখেছে । বেশি ঘ্যাম হলে যা হয়। আমি মনে মনে বললাম “উফফ পারিনা, পিনিক দ্যাখো ছেলের! কে দেয় এদের? ” । মনের ভেতর থেকে উত্তর এলো : “ওরে বোকা, এদেরকেই দেয় ! এখন দ্যাখ , জ্বল আর লুচির মতো ফোল !” ।

কি মুশকিল , এখনো অটো ছাড়ছেনা । মনে হচ্ছিল অটোওয়ালাটার মাথায় এক বালতি আলকাতরা ঢেলেদি। বেড়িয়ে যাবে মস্তানি। আমার ঘাম হচ্ছিল অনেক আর গা জ্বলছিল ভীষণ। কিন্তু তাও একটু গলা নামিয়ে সবিনয়ে বললাম, “ভাইটি , চল এবার, দেরী হয়ে যাচ্ছে” । এবার মনে হল ছেলেটা আমার কথাটা একটু শুনল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল “আগের মাসে ভাড়া বাড়ানোর কথা ছিল , বাড়াতে দিলনা ; জিনিস পত্রের যা দাম , এবার তো লসে চলতে হবে কাকু ..” । আমি ওর কথাটা কেটে বললাম, ” তোর দরকার পড়ে আমি তোকে ১০ টাকা বেশি দেব, উচ্ছন্নে যাওয়ার জন্য , তুই তাড়াতাড়ি চল তো দেখি”। অটোওয়ালা টাকার কথা শুনে নিজের সিটে এসে বসল। তারপর ওর হঠাত কি একটা খটকা লাগল। ও পেছনে ফিরে বলল, “কিসের জন্য টাকা দেবেন বললেন?”। আমি ব্যস্ত হয়ে বললাম ” ওরে কিছু না রে, কিছু না। একটু মিষ্টি কিনে খাবি না হয় টাকা দিয়ে “।

আমার কথা শুনে ও অটোতে স্টার্ট দিল। আমার চোখের চশমাটা বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে আজকাল। কেন কে জানে। আজকে যেন একটু বেশিই ঘন ঘন ঝাপসা হচ্ছিল। চুশমাটা খুলে জামাতে একটু মুছলাম। মুছতে মুছতে বললাম “বুঝলি দুর্যোধন, এখন উচ্ছন্নে যাওয়াটাই হল ইস্টাইল “। অটোওয়ালা হঠাৎ ব্রেক কষল। আমি বললাম “কি হল দাঁড়ালি কেন ?” ও পেছন ফিরে বলল ” দেখুন কাকু আমার নাম পল্টু। ঐসব দুর্যোধন, ফুর্জধন কায়দা মারা নাম আমার পোষায় না “। আমি বললাম ” আচ্ছা বাবা পল্টু, চলো বাবা তুমি “।

অটো আবার চলতে লাগল। আমি চশমাটা চোখে দিয়ে বললাম, “আচ্ছা পল্টু, তুই দুর্যোধন কে চিনিস?” পল্টু জামার হাতাটা একটু ঠিক করতে করতে বলল “না কাকু, আপনি এত দুর্যোধন দুর্যোধন করছেন কেন বলুন তো ?” আমি পল্টুকে আশ্বাস দিয়ে বললাম, ” ওরে, তুই দুর্যোধন কে চিনিস না? দুর্যোধন, দুঃশাসন, এরা তো তোদের এই ইয়ং জেনারেশনের আইডল রে”। পল্টু বলল ” কেন কি করেছিল সে? ” আমি বললাম ” দুর্যোধন ছিল সেই যুগের ডন। তুই দেখনা কিছুদিনের মধ্যেই দুর্যোধনের হিরোইসম এর ওপর কেউ না কেউ মুভি বানিয়ে ফেলবে। সারুখের ডন যত না চলেছিল, দুর্যোধন তার থেকেও বেশি হিট হবে। তবে এই গল্পে আরেকটা খুব ইম্পরট্যান্ট চরিত্র আছে বুঝলি, নাম হল শকুনি। তবে সেসব গল্প বলতে সময় লাগবে। আমি একটা বই লিখবো ভাবছি শকুনির উপর, তোকে দেবো, পড়ে দেখিস। এখন বাবা তুই জলদি চল।” পল্টু বলল, ” এতই যদি পড়তে পারতাম তাহলে এই অটো চালাতাম না কাকু।” আমি বললাম ” ফালতু কথা বলিসনা, আমি দেখতেই পাচ্ছি তুই কত অটো চালাচ্ছিস। অটো চালাচ্ছিস কম এর রাস্তায় সুন্দরী মেয়ে দেখছিস বেশি”। পল্টু ফিক করে হাসলো। হাসতে হাসতেও রাস্তায় মেয়ে দেখছিল। আমিও দেখতে পেলাম ফুটপাতে হাঁটতে থাকা মেয়েটিকে। খুব একটা সুন্দরী নয়, তবে নিজেকে ভালো মেন্টেন করেছে। চোখে পড়বে।

কিন্তু কোথা থেকে যেন হঠাৎ এল বিপদ। পল্টুর তো চোখ ফুটপাতে, মন এক্সরে মেশিন খুঁজছে, আর অন্য জিনিসপত্র , ইন্দ্রীও কোথায় কে জানে। ও চালাচ্ছে অটো! কিন্তু অটোটার তো আর বুদ্ধি নেই, তাই সেও সোজা গিয়ে রাস্তার ধারে একটা রেলিংয়ে দুম করে মারলো ধাক্কা। সঙ্গে সঙ্গে একটা চাকা স্কিড করে অটো তখন পাল্টি খেতে শুরু করছে। আমি ঝাপসা চশমার মধ্যে দিয়ে দেখতে পেলাম বিপদটা আমার দিকে উর্ধশাসে ছুটে ছুটে আসছে। অটোটা প্রায় হাওয়ায় লাফ দিচ্ছে। আমার হঠাৎ অদ্ভুত অদ্ভুত চিন্তা মনে পড়তে শুরু করলো। সেই এক নিমেষেই।

অটো ২ ডিগ্রি কাত…
আচ্ছা আমার মাথার তলায় কি কোনো বালিশ আছে? কই নাতো। ওটা বোধহয় অন্য কোনো গল্পে পড়েছিলাম। গুলিয়ে গেল।

অটো আরও কিছুটা হেলতে আরম্ভ করেছে…
মাথার অন্য একটা প্রান্তে কার যেন গলা শুনতে পেলাম। আরে এটা তো আমার গিন্নির গলা। কি বলছে দেখিতো। ভালো করে শুনলাম। গিন্নি বলছিল “তুমি কিন্তু বাসে করে যেও, আজকাল অটোয়ালা গুলো খুব বাজে চালায়, প্রতিদিন দেখি একসিডেন্ট হচ্ছে। ” মনটা কেমন মুষড়ে গেল শুনে।

অটো এখন প্রায় ৮৫ ডিগ্রি বেঁকে ত্যারচা ভাবে হাওয়ায় অবস্থিত…
মনে পড়ল আমার ছেলের মুখটা। শুরুর দিকে পেন্সিলে আঁকা ওর মুখের একটা স্কেচ ভাসছিল চোখের সামনে। একবার ও আমায় এসে মুখ চুন করে বলেছিল, ” বাবা, আজকে ম্যাডাম আমার খাতায় একটা কমেন্ট লিখে দিয়েছে। আর ম্যাডাম তোমার নাম জিজ্ঞেস করছিল। ” আমার শুনে একটু খটকা লেগেছিল। আমি বলেছিলাম “দেখা তো দেখি কি কমেন্ট লিখেছে।” তারপর ওর খাতায় দেখেছিলাম স্টার দিয়ে লেখা ছিল, “পেরেন্ট টিচার মিটিং অন 21স্ট অগাস্ট। ফাদার হ্যাজ টু বি প্রেজেন্ট। ” ওটা স্টার না মাকড়সার জালের নক্সা বুঝিনি। তবে হাতেরলেখাটা চেনা লেগেছিল। জিজ্ঞেস করেছিলাম ” হ্যাঁ রে তোর ম্যাডাম এর নাম কি?” । ও বলেছিল ” ইন্দিরা মুখার্জী” ।

অটো এবার পুরোপুরি ৯১ডিগ্রি…
অঞ্জন দত্তের একটা গানের লাইন বাজছিল মনের কোনো একটা দিকে। “এখানটাতে প্রথম দেখা… আমার প্রথম প্রেমিকা…র। হাত ধরে হাঁটছে অন্য কেউ… । … হঠাৎ বড় হয়ে যাওয়া।” সেই ইন্দিরা মুখার্জী! অনেক আলো আধারী রেস্তোরাঁ পেরিয়ে আজকে আমার ছেলের ক্লাস টিচার!

কিশোর বয়সে তারান্টিনোর নন লিনিয়ার স্টোরি টেলিং দেখে খুব অবাক হয়েছিলাম। মনে মনে বলতাম ” আগের ঘটনা পরে, পরের ঘটনা আগে, এ আবার হয় নাকি। আঁতলামোর এক শেষ”। কিন্তু এখন বুঝি, প্রেম , ভালোবাসা, রুমাল, বিড়াল, গল্প, পাঠক, সব কিছুই নন লিনিয়ার। স্রেফ ‘ঋ’ আর ‘এ’ হল লিনিয়ার। কারণ তারাই কেবল বাংলা বর্ণমালার অবলুপ্ত প্রায় প্রাণী, ‘ লি’ অক্ষরটি র নিয়ার এ অবস্থিত। (কেউ মারবেন না :প)

অটো ৯২ ডিগ্রি…
মনের অন্য একটা দিকে আমি একটা ছোট দোতলা বাড়ি দেখতে পাচ্ছিলাম। আমি জানি ওটা ইন্দিরার বাড়ি। খুব চেনা বাড়িটা। কোথায় দরজা, কোথায় জানলা, কতগুলো ঘর সবই জানি। ওই বাড়িতে একটা খুব রহস্যময় ঘর আছে। সেই ঘরে একসময় অনেকদিন থেকেছিলাম। অনেক খেলা করেছি ছুটে বেড়িয়েছি। ওই ঘরে অনেক বাক্স এদিক ওদিক ছড়ানো থাকতো। প্রতিটা বাক্সেই কিছু না কিছু থাকতো। কোনটাতে জামা কাপড়, কোনটাতে গল্পের বই, কোনটাতে সাজগোজের জিনিস, আবার কোনটাতে বিড়াল। ইন্দিরা মাঝে মাঝে সেই ঘরে ঢুকতো, কোনো একটা বাক্স থেকে জিনিস পত্র নিয়ে ব্যবহার করে আবার বাক্সে জিনিস রেখে ঘর থেকে বেরিয়ে যেত। ওই ঘরেই অন্য বড় একটা বাক্সে থাকতাম আমি। আমার সাথে এসেও ও মাঝে সাঝে কথা বলতো। যখন আমায় বেশি সময় দিত, পাশের বাক্সের বিড়ালটা ভুগত অনাদরের অসুখে। কেমন একটা অদ্ভুত স্বরে ডাকত আর গান গাইত, যার অর্থ আমার কল্পনায় ফুটে উঠত : যদি এক মুহূর্তের জন্যেও আমায় চাও, সেটাই ম্যাও।

প্রথম প্রথম সেই ঘরের ভেতরেই থাকতাম আমি, ঘরের বাইরে বেরোতাম না। একদিন কৌতুহল বাড়ল। উঁকি মেরে দেখলাম ঘরের বাইরে কি আছে। ইন্দিরা আমায় দেখতে পেয়ে জিজ্ঞেস করেছিল ” কিরে তুই বাইরে কেন?” আমি বলেছিলাম “আমার এই ঘরের ভেতর সারাক্ষন বসে থাকতে ভালো লাগেনা। আমি বাকি বাড়িটাও দেখতে চাই।” ইন্দিরা বলেছিল ” হ্যাঁ আমিও ভাবছিলাম তোকে দেখাবো সবটা। ঘুরবো তোকে নিয়ে। তুই তো আমার ভ্রূণ হবি, তুই ই তো আমার ভবিষ্যৎ। আর তুই যে ঘরে থাকিস, ওই ঘরটার নাম হলো “মন”। ”

সেদিন আমরা চিলেকোঠায় গেছিলাম। সূর্য ডোবার পর অন্ধকারে ঠোঁটে ঠোঁট ডুবেছিল। কয়েকদিন পর দোতলার দুটো ঘর ঘুরিয়ে দেখিয়েছিল আমায়। একতলায় আরেকটা ঘর ছিল। ওখানে অবশ্য যাওয়া মানা ছিল। ওটা বন্ধ থাকত।

আরো কিছুদিন কেটেছিল যত্নে। ২৫ বা ২৬ দিনের মাথায় একদিন ঝগড়া হল ভীষণ। তুলকালাম ঝগড়া। ঝগড়া শেষে আমি আমার ঘরের ভেতর ঢুকে পায়চারি করছিলাম। সেইদিন হঠাৎ দেখলাম ঘরের কোনের দিকের একটা অপরিস্কার বাক্স থেকে সরু ধোঁয়ার ফিতে সিলিং এর দিকে যেতে যেতে মিলিয়ে যাচ্ছে। আমি মনে মনে ভেবেছিলাম ওটা কোনো আধপোড়া সিগারেটের টুকরো হবে। তার হাঁফানি মার্কা ধোঁয়া কি আর সিলিং এর উচ্চতা ছুঁতে পারবে?

কিন্তু একটু পরেই বুঝলাম যে ধোঁয়া বেড়ে চলেছে। এ যে আগুন! ধোঁয়া এবার দরজার ফাঁক দিয়ে অন্যান্য ঘর গুলোতে যাচ্ছিল। আমি হন্তদন্ত করে দরজা খুলে বেরোতেই দেখি ইন্দিরা দাঁড়িয়ে। মুখটা কালো। আমি জিজ্ঞেস করলাম ” কি হয়েছে তোর? শরীর ঠিক আছে? তুই জানিস ঘরে আগুন লেগেছে?”

ও মাথা নেড়ে বলেছিল, ” হ্যাঁ জানি। আমার চারধারে আগুন। আমার শরীরে ব্যাথা। আমার ভালো লাগছেনা। তুই চলে যা এখান থেকে। আমি তোকে সেই জন্যই ডাকতেই আসছিলাম। ” আমি বলেছিলাম ” আমি তোরই অংশ। আমায় খুলে বলবিনা কি হয়েছে?”

ওর কথা শেষ হওয়ার আগেই আমি ঢুকে গেছিলাম আমার ঘরের ভেতর। খুব অভিমান হয়েছিল। আমি ঢুকে গেছিলাম ঘরের ভেতর।ইচ্ছা করছিল চারধার ভেঙে তছনছ করে দি। কিন্তু কিছু করিনি। গুমরে ছিলাম সেদিন। রাত্রের দিকে ঘুম আসছিলনা। নিচের তলা থেকে যেন কেমন একটা গুড় গুড় শব্দ আসছিল মেঘ ডাকার মতো। আমি তাও বেরোইনি ঘর থেকে।

পরের দিন, ২৭ তম দিনে, রাত্রে আমার মাথায় বাই উঠলো। মনে পড়ল ইন্দিরা নিচের ঘরে যেতে বারণ করেছিল। একবার চুপি সাড়ে দেখে আসি কি আছে ওখানে।

সিঁড়ি বেয়ে পা টিপে টিপে নামলাম নীচে। দেখলাম ঘরের বাইরে লেখা প্রবেশ নিষেধ, আর ঘরের ছিটকিনি বাইরে থেকে বন্ধ করা। ঘরের ভিতর থেকে যেন আবার শুনতে পেলাম ওই মেঘ গর্জনের মতো আওয়াজটা। আওয়াজটা আরো বাড়ছিল আস্তে আস্তে। হঠাৎ দেখলাম দরজাটা কাঁপছে। আমার ভয় লাগছিলো। তাও ছিটকিনির ল্যাচটা খুলে দিলাম। এরপর নিমেষে ভেতর থেকে লাল রক্তের বন্যা এসে ভাসিয়ে দিলো চারধার। আমিও ভেসে গেলাম সেই স্রোতে। বীভৎস স্রোত। হাবুডুবু খেতে খেতে আমি পড়লাম গিয়ে বাথরুমের স্যাঁতস্যাঁতে মেঝেতে।

আমার ধুলো পড়া গাঢ় নীল সত্ত্বাটা ধুয়ে যায় লালে। নীল কল্পনার রং। উত্তাপ আর প্রানের রং লাল।

অটো ১৮০ ডিগ্রি ঘুরে গেছে। আমি ফিরে এসেছি সম্বিতের অন্য প্রান্তে…
চশমা আবার ঝাপসা। একি, সত্যিই তো! বাথরুমের মেঝেতে বসে আমি কি করছি?

বাইরে থেকে গিন্নি বাথরুমের দরজায় টক টক করে বললো “কিগো, তোমার আর কতক্ষন? ঘুমিয়ে পড়লে নাকি? একটা বালিশ নিয়ে ঢুকো পরেরবার থেকে।”

আমি চেঁচিয়ে বললাম ” হয়ে গেছে, বেরোচ্ছি, ২মিনিট” ।

“তুমি আজকে পেরেন্ট টিচার মিটিং আছে বলে বেরোবে বলছিলে যে। তুমি কিন্তু বাসে করে যেও, আজকাল অটোয়ালা গুলো খুব বাজে চালায়, প্রতিদিন দেখি একসিডেন্ট হচ্ছে। ”

অটো এখন ৩৬২ ডিগ্রি…
না, ভবিষ্যৎটা বদলাতে হবে। আমি বাথরুম থেকে বেরিয়ে গিন্নিকে বললাম “তোমার জন্য একটা জিনিস এনেছি গো”।

গিন্নি জিজ্ঞেস করলো ” মানে? হঠাৎ আমার জন্য কি আনলে? গড়িয়াহাটে সেদিন শাড়িটা কিনে দিতে বললাম দিলে না তো। আবার আজকে গিফ্ট এনে মন ভোলাতে এসেছ? ”

আমি বললাম ” তুমি চকোলেট ভালো বাসো বলে তোমার জন্য ক্যাডবেরি ফ্রুট ‘ণ নাট এনেছি দেখো..” , বলে আমি ফ্রিজ থেকে বার করে ক্যাডবেরিটা দিলাম গিন্নিকে। গিন্নি পেয়ে একগাল হাসলো। আমি জড়িয়ে ধরলাম ওকে।

… কিন্তু অটোটা শেষ পর্যন্ত পাল্টি খেতে খেতে কল্পনার কোন গভীরে গিয়ে মিশেছিল তা আমি জানিনা। তবে গড়িয়াহাটে যখন গিন্নিকে শাড়িটা কিনতে নিয়ে গেছিলাম, লাকি ড্র-এ একটা লাল অটোর ছবিওয়ালা দেওয়াল ঘড়ি গিফ্ট পেয়েছিলাম।

ভালোবাসা – জন্মান্তর

পরের জন্মে ‘সৃষ্টি’ হবো আমি। সৃষ্টি করবো তোমায়; আমার সার্বিক কৌশল আর নৈপুণ্যের আধার। আমার সকল শিল্পের জোয়ার। ঘন প্রানের উদ্যমসিক্ত নির্যাসে ভরাব তোমার প্রত্যেকটা ধমনী।

তার পরের জন্মে আমি তোমার হাতপাখা হবো। আমায় নেড়ে নেড়ে হাওয়া খেয়ো তুমি উজ্জ্বল দিনে, লোডশেডিং হলে, ভিড় বাসে বসে, টিকিট কাউন্টারে দাঁড়িয়ে, আর নিরিবিলিতে, একাকিত্বে।

তার পরের জন্মে আমি হবো তোমার চোখের পলক। কতবার ডুবে যাবো তোমার চোখের জলের বন্যায়। দেখবো তোমায় আয়নায়। চোখে আঞ্জানি হলে মিশব তোমার ব্যাথায়।

তার পরের জন্মে আমি হবো উত্তাপ। তোমায় ভরিয়ে রাখবো প্রানের উচ্ছলতায়। সুস্বাদু খাবারের উপর বসে আমি উদ্দীপ্ত করবো তোমার জিভের গ্রন্থিগুলো। শীতকালে চাদরের ভেতর ঢেকে রাখবো তোমায় আরামদায়ক সংরক্ষায়।

তার পরের জন্মে হব আমি তোমার ভোরের স্বপ্নে কুড়িয়ে পাওয়া একটা গোলাপি ঝিনুক। তুমি ঘুমের মধ্যে এপাশ ওপাশ ফিরে আমায় নিয়ে খেলবে। আর আনন্দে দিশেহারা হয়ে পাশ বালিশটা জড়িয়ে ধরবে। আমিও তোমার কল্পনার সমুদ্রে আনন্দে আত্মহারা হয়ে ডুব দিয়ে উড়ে বেড়াবো।

তার পরের জন্মে আমি হবো ভাঙ্গন ধরা চাঁদের ছোট্ট একটা ফাটল। সন্ধ্যাবেলা নেকড়ে বাঘের প্রেমের ব্যর্থতার গোঙানিতে তুমি খুঁজে নিও আমার আর্তনাদ গুলো। দেজাভুর আনাচে কানাচে।

তার পরের জন্মে আমি তামাক হবো। নিয়ন গড়ানো ফাঁকা রাস্তার পায়চারিতে ধোঁয়া হয়ে ঢুকবো তোমার ফুসফুসে। গুনব তোমার ক্ষতর দাগ গুলো। গুনতে গুনতে ঘুমিয়ে পড়বো। তারপর আরেকটা ক্ষত হয়ে রয়ে যাবো।

তারপরের জন্মে আমি হতে চাই তোমার মনের আগাছায় জন্মানো একটা অনাদরের কুঁড়ি। কেউ খুঁজবেনা আমায়। কেউ ভাববেনা আমায়। আমি শুধু থাকবো তোমার মনে লুকিয়ে। আর অন্য চিন্তার ব্লিচিং যখন ঢেলে দেবে আমার ওপর, আমি মিলিয়ে যেতে চাই তোমার মনের নরম মাটিতে।

শেষ জন্মে আমি হবো উল্কাপাত। ঝাঁপিয়ে পড়বো পৃথিবীর কোণে কোণে। ধোঁয়া আর বিষাক্ত হাওয়ায় ভরিয়ে দেবো বায়ুমণ্ডল। নিভিয়ে দেবো পৃথিবীর শেষ প্রাণের প্রদীপ গুলো। নিভে যাবে তুমিও। সব হবে শান্ত। নিস্পন্দ। চুপ।

ভালোবাসা শুধু সৃষ্টির নয়। ভালোবাসা শুধু স্থিতির নয়। ভালোবাসা বিনাশের সাথেও একাত্ম। সময়ের চক্রে ব্রাত্য। যেন তেল ফুরানো একটা প্রদীপ।

ভালোবাসা – রক্ত আর সিঁদুর

পলকে রাখবো তোমায় আমার সকল উজান দিয়ে
দিওনা ঢেলে অবহেলা আর ঘেন্না আগুন ঘি এ।
মোরবো তোমার সারা চেহারায় অস্থি মজ্জা নিয়ে,
রেখোনা কেবল আমায় প্রবল মিথ্যা নেশায় জিয়ে।
রাখবো তোমার ধার তলোয়ার আমার পাঁজর ছুঁয়ে,
খুঁজোনা তুমি উত্তাপ আর ঠোঁটের ভিতর শুয়ে।
পোড়াও তুমি পোড়াও আমায় বিষাদ আগুন লয়ে,
তোমার নাম ই রইবে লেখা ছাইয়ের ধূসর ক্ষয়ে।
শান্ত সাগর ভুলবো আমি ঢেউয়ের সাথে বয়ে,
নোঙর বিহীন জাহাজ আমার তোমার ঝড়ের জয়ে।

.
জানবো তোমার নরম হৃদয় মুরবো রুমাল দিয়ে,
তোমার আমার পেস্তা প্রেমে পুষব পায়রা টিয়ে।
তোমায় আমার মনের ফুলের পাপড়ি গুলো ধুয়ে,
সঁপবো ঘ্রাণের মুক্তধারা শিউলি পলাশ জুঁইয়ে।
তোমার জন্য আনবো বরফ মেঘের দেশে গিয়ে,
গলবে পরে স্মৃতির আবেগ তোমার দু চোখ দিয়ে।
দেখবো তোমায় অ আ ক খ-এ খুঁজবো A, B, C-এ
তোমার চিঠির বর্ণমালায় থাকবো তোমার হয়ে।
পলকে রাখবো তোমায় আমার সকল উজান দিয়ে,
রক্ত থেকে সিঁদুর করে করবো তোমায় বিয়ে।

ভালোবাসা – অভিযোগ

আমি খুব বাজে ছেলে, প্রেম দিতে পারিনা
পা নাচাই আনমনে, ফাউ ঝাড়ি মারিনা।
আমি খুব বাজে ছেলে, ডায়লগ ঝাড়িনা
তুমি যত আড়ি করো আমি বলি “আড়ি না”।

আমি খুব বাজে ছেলে, ঘড়ি দেখি দেওয়ালে
হাত ঘড়ি থেমে গেছে শিশ দেওয়া খেয়ালে।
আমি খুব বাজে ছেলে, গালে ঠোঁট ছোয়ালে;
ট্রিমারেতে ধার নেই খোঁচা দাড়ি চোয়ালে।

আমি খুব বাজে ছেলে, ছাতা ব্যাগে রাখিনা
বৃষ্টিতে ভিজে যাই, ক্রিম গায়ে মাখিনা।
আমি খুব বাজে ছেলে, স্বপ্নেতে থাকিনা
মাঝরাতে ঝগড়ায় দমকল ডাকিনা।

আমি খুব বাজে ছেলে, দেখতে অসেক্সী
তোমাদের ক্রাশ জানি ব্যোমকেশ বক্সী।
আমি খুব বাজে ছেলে, বুকে নেই অক্সি
ফুসফুস খুঁজে পাবে বিড়ি আর পেপসি।

আমি খুব বাজে ছেলে, টক ঝাল বুঝিনা
ফুচকার ভেতরেতে আলুমাখা খুঁজিনা।
আমি খুব বাজে ছেলে, ধূর্ত বা পাজি না;
প্রেমিকার ভালোবাসা ভাগ দিতে রাজি না।

আমি খুব বাজে ছেলে, বেশি পায় তেষ্টা
পোড়া ঠোঁটে পান করি সিগারেটের শেষটা।
আমি খুব বাজে ছেলে, লোকের উপদেষ্টা,
অপাত্রে দান করে পুড়ে গেল দেশটা।

আমি খুব বাজে ছেলে, ঝিঁঝিঁ ধরে পায়েতে
বোরোলিন লাগাইনা ঘাড়ে পাওয়া ঘায়েতে।
আমি খুব বাজে ছেলে, চিনি খাই চায়েতে,
ভিড় বাসে গান গাই ঘামে ভেজা গায়েতে।

আমি খুব বাজে ছেলে, ফিউচার ঘুমিয়ে
আলসেমি ভালো পারি, ল্যাদ খাই জমিয়ে।
আমি খুব বাজে ছেলে, চোখ রাখি রাঙিয়ে,
ভালো আছি, লাভ নেই এত মাথা ঘামিয়ে!

আমি খুব বাজে ছেলে, লিখি বাজে কবিতা
কেউ যদি গালি দেয় বলি, “সব ভনিতা”।
আমি খুব বাজে ছেলে, শুনে রাখো দাবিটা
টর্চ জ্বেলে খুঁজে দিও হৃদয়ের চাবিটা!

ভালোবাসা – কোলকাতা

প্রবল অপেক্ষার পর দেখা পেলাম তোমার। পার্ক সার্কাস থেকে আমরা বাসে করে গেলাম রবীন্দ্র সদন। তারপর মেট্রো এ শোভাবাজার। এরপর অটো এ আহিড়ীটোলা লঞ্চ ঘাট। সেখানে বসলাম নিমতলা মহা শ্মশানে। IMG-20180812-WA0034রোদ্দুর আর ছাতার সংঘর্ষে আমরা কাছে এলাম। তারপর হাঁটতে হাঁটতে আমরা পুরোনো রাস্তা ধরে চলে গেলাম বড়বাজারের ফুলের বাজারে। হরেক রকম ফুল। কোথাও গাঁদা ফুলের পাহাড় তো কোথাও বেলফুলের মালার সারি। IMG-20180812-WA0035আমি দুটো অপরাজিতার মালা কিনেছিলাম। আর তুমি তিনটে গোলাপ। গোলাপ হাতে করে আমরা চলে গেলাম হাওড়া ব্রিজের উপর। কি ঠান্ডা হাওয়া দিচ্ছিল! হওয়া এ ফুলের কাঁপা কাঁপা পাপড়ি দেখতে দেখতে তোমায় প্রপোজ করা। তোমার চোখে চোখ রাখা। সম্বল পাওয়া। হওয়ায় তোমার চুল খামখেয়ালি প্রবাহে মাতাল। আমি ঢেউ দেখলাম আর দূরের নীল সীমানার দিকে তাকিয়ে আমাদের ফেলে আসা কাটানো সময় গুলোর কথা ভাবছিলাম।IMG-20180813-WA0016.jpg এরপর আমরা হাঁটতে হাঁটতে স্ট্র্যান্ড রোড বরাবর অনেক পুরোনো বাড়ির পাস দিয়ে, গাড়ির ফাঁকে ঢুকে দ্রুত চুমু আর আইসক্রিম খেতে খেতে পৌঁছে গেলাম প্রিন্সেপ ঘাট। IMG-20180813-WA0013.jpgবিকেল গড়িয়ে সন্ধে হবে তখন। মালা গুলো উৎসর্গ করলাম গঙ্গায়। একটু মন খারাপ, আবার মানানো, আবার রেগে যাওয়া লেগে ছিল পথের পরে। তারপর রাস্তার ধারের আলো গুলো জ্বলে উঠতে থাকল, সাথে সাথে আমাদের একাত্মতা। হাসি ঠাট্টা চিমটি কাটা, আবার নিমেষে কাছে আসা। এ এক অদ্ভুত রসায়ন। তোমার আংটি পরে আমাদের বিলিতি কায়দায় ইনফর্মাল এনগেজমেন্ট হল সন্ধ্যার কমনীয়তা কে সাক্ষী রেখে।IMG-20180812-WA0048 তারপর নদীর ধার দিয়ে শিশ দিতে দিতে হাঁটতে হাঁটতে আমরা ক্লান্ত হলাম। নদীর ধারে আরতি দেখে চোখ ধুলাম। এবার ফেরার পালা। অনেককে জিজ্ঞেস করে একটা বাস পেয়ে এলাম ধর্মতলা। ক্ষিদে পেয়েছিল দুজনেরই। তাই ফলের রস খেয়ে চললাম পার্ক সার্কাস ময়দান! যাওয়ার সময় অটোতে আয়নায় তোমার মুখটা দেখা, আর ভ্যাংচানো, এতো আমাদের স্বভাবই হয়ে গেছিল! পার্ক সার্কাসে গিয়ে কাদার উপর কাগজ পেতে বসে আমরা আবার কাছে এলাম। তোমার নখের দাগ আর প্রেমের ভাগ আমার কালো আকাশের উজ্জ্বল তারামণ্ডল। সময় শেষ। জানিনা কিভাবে শেষ। তোমায় ছেড়ে এলাম তোমার হোস্টেলে। বাড়ি ফেরার পথে আমি আচ্ছন্ন হয়ে ছিলাম তোমার স্মৃতির গন্ধে আর ধমনীর রন্ধ্রে। এই বিশাল কোলকাতায় অনেক যত্নে মুড়ে রাখা তোমার ভালোবাসা যেন গুপ্তধন।

ভালোবাসা – পলক

প্রথমবার যখন আমার চোখে চোখ রেখেছিলে, সময়কে থামতে দেখেছিলাম। ধোঁয়া ভরা আমার জীবনে তোমার দেখা পাওয়া, তোমার ফোন, তোমার কাঁধের গন্ধ বা তোমার অস্তিত্বের সামান্যতম ইঙ্গিত যেন চারধারে ঝলমলে আলো জেলে দেয়।

পলক, সারাজীবন এভাবেই আমার ছোট্ট পৃথিবীটাকে আলোয় ভরিয়ে রেখো। তোমাতে ডুবতে আর একটুও বাকি নেই। তোমায় ছাড়া আকাশ নীল হারায়; নদী গতি হারায়, আর জীবন প্রাণ হারায়।

চাইনা তোমার বুক, চাই বুকে স্থান। চাইনা চুম্বন, চাই নিবিড় চাহুনি। চাইনা তোমার শরীর, চাই সঙ্গ আর হৃদয়ের চাবি। চাই ভোরের স্বপ্নে স্থান।

যে প্রদীপ তুমি জ্বেলেছিলে প্রাণে। নিভিওনা তারে, রেখো যতনে। যে খোলা হওয়া তুমি বহিয়াছ অকাতরে, প্রেম শুধু দিয়ে গেছ, ঋণী করে গেছ, সেই হওয়া বুকে মোর, মাতলায় দিনভর, পলকে পলকে মোরে জড়াইয়া ধরে।